×

ময়মনসিংহ

কৃষিঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে চেক রেখে মামলার অভিযোগ

Icon

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম

কৃষিঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে চেক রেখে মামলার অভিযোগ

ছবি : সংগৃহীত

প্রথমে গ্রামের অসহায় পরিবারগুলোকে টার্গেট করে ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন। পরে হিসাব খুলিয়ে চেক নিয়ে আদালতে মামলা করে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার খলিলুর রহমান মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। খলিলের এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন এলাকার অনেক সহজ-সরল মানুষ। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও তারা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।

জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা নেওয়াজ শরীফ ও নুরেছা বেগম মা-ছেলে। নুরেছা বেগমের স্বামী মারা যাওয়ার পর অর্থাভাবে তাদের সংসার চলত। নেওয়াজ শরীফের চাচা জিয়াউর রহমানের তৈরি করে দেওয়া ঘরেই তাদের বসবাস।

২০২২ সালের ৩১ আগস্ট সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে পাশের কুকাইল গ্রামের খলিলুর রহমান মণ্ডলের মাধ্যমে ফুলপুর কৃষি ব্যাংক থেকে মা-ছেলের যৌথ নামে দুই লাখ টাকা ঋণ নেন তারা। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঋণ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে খলিলকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়। পাশাপাশি ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা বলে তিনটি ব্ল্যাংক চেক নিজের কাছেই রেখে দেন তিনি।

পরবর্তীতে জমিজমা নিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খলিলের বিরোধ সৃষ্টি হলে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর ময়মনসিংহ আদালতে ওই মা-ছেলের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির মামলা করেন খলিল।

সম্প্রতি চন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন নেওয়াজ শরীফ ও নুরেছা বেগম। দুজনেই ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মামলা হওয়ার পর থেকে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ভয়-আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।

ভুক্তভোগী নেওয়াজ শরীফ বলেন, পূর্বপরিচিত খলিল একদিন বাড়িতে এসে ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে দুই লাখ টাকা কৃষিঋণ পাইয়ে দিতে তিনি ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। তাঁর কথামতো জমির কাগজপত্র ও তিনটি চেক দিয়ে ঋণ তুলি এবং ৫০ হাজার টাকা তাঁকে দিই। পরে আমার চাচার সঙ্গে খলিলের বিরোধ হলে আমাদের বিরুদ্ধে সাত লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা করেন। মামলায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ১ মার্চ তাঁর বাড়িতে বসে আমি সাত লাখ টাকা ধার নিয়েছি। অথচ ওই সময় আমি ঢাকায় কর্মস্থলে ছিলাম। এর প্রমাণও রয়েছে।

ভুক্তভোগী নুরেছা বেগম বলেন, খলিল আমাদের বলেছিলেন, কৃষিঋণ তুলতে হলে জমির কাগজ ও চেক ব্যাংকে জমা দিতে হয়। আমরা সেই বিশ্বাসে ব্যাংকের ভেতরে একজনের কাছে সব কাগজপত্র জমা দিই। পরে সেই চেক ব্যবহার করে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে সাত লাখ টাকার মামলা করেন। আমাদের এত টাকা দেওয়ার কোনো সামর্থ্য নেই।

নেওয়াজ শরীফ ও নুরেছা বেগমের মতো খলিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন একই গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুল খালেক ফকিরও। তিনিও বর্তমানে আদালতে মামলার মুখোমুখি।

জানা যায়, ২০২৪ সালে আব্দুল খালেক ফকির ফুলপুর কৃষি ব্যাংক শাখা থেকে নেওয়া সাত লাখ টাকার সিসি ঋণ পরিশোধ করেন। পরে জমিজমা নিয়ে খলিল মণ্ডলের সঙ্গে বিরোধের জেরে চলতি বছরের ৯ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে ২৭ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা করা হয়।

আব্দুল খালেক ফকির বলেন, ব্যাংকে চেক জমা দিয়েই ঋণ নিয়েছিলাম। কিন্তু সেই চেক ব্যবহার করে খলিল আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আমার ধারণা, এ ঘটনায় ব্যাংকের কিছু লোকও জড়িত। না হলে খলিল চেক পেলেন কীভাবে? এলাকায় তিনি কৃষি ব্যাংকের দালাল হিসেবে পরিচিত। তাঁর মাধ্যমে শত শত মানুষ ঋণ নিয়েছেন। এতে যেমন তিনি সুবিধা নিচ্ছেন, তেমনি ব্যাংকের কিছু লোকও লাভবান হচ্ছেন। মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।

স্থানীয় বাসিন্দা জনাব আলী বলেন, খলিল মূলত কৃষি ব্যাংকে দালালি এবং দাদনের ব্যবসা করেন। তিনি আমাকেও একটি ঋণ পাইয়ে দিয়েছিলেন। পরে আমার সম্পত্তির কাগজপত্র ব্যবহার করে আরো দুজনকে ঋণ পাইয়ে দেন। নেওয়াজ শরীফ ও নুরেছা বেগমের বিরুদ্ধে করা মামলায় আমাকে সাক্ষী করা হয়েছে। অথচ আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।

স্থানীয় বওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুব আলম ডালিম বলেন, খলিল একজন দালাল। তাঁর টার্গেট গ্রামের সহজ-সরল মানুষ। তিনি মানুষকে ঋণ পাইয়ে দিয়ে নিজেও সুবিধা নেন। আবার ব্যাংকের কথা বলে চেক নিজের কাছে রেখে দেন। মতবিরোধ হলেই মামলা করেন। এর দায় ব্যাংকও এড়াতে পারে না। প্রতারণার শিকার অসহায় মানুষগুলোর পাশে সবার দাঁড়ানো উচিত।

অভিযোগের বিষয়ে ফুলপুর কৃষি ব্যাংকে গিয়ে খলিলুর রহমান মণ্ডলকে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংকে আমার সিসি ঋণ রয়েছে, তাই নিয়মিত ব্যাংকে আসি। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তারা আমার পাওনা পরিশোধ না করায় আমি চেক জালিয়াতির মামলা করেছি। আর চেক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়নি, টাকা নেওয়ার সময় তারাই আমাকে দিয়েছিল।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ফুলপুর উপজেলা শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার সাইদুর রহমান বলেন, খলিলুর রহমান মণ্ডল আমাদের একজন গ্রাহক। তাই তিনি নিয়মিত ব্যাংকে আসেন। আমি বেশি দিন হয়নি এখানে যোগদান করেছি। আগে কোনো সমস্যা হয়ে থাকলে সে বিষয়ে বলতে পারব না। তবে বর্তমানে দালালের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ভুক্তভোগীদের আইনজীবী এবং সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সজীব সরকার রোকন বলেন, মামলা দুটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে। আদালতেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ময়মনসিংহ কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক জামিল আহমেদ বলেন, ব্যাংক থেকে চেক বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কৃষিঋণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের চেক জমা রাখা হয় না। তবে খলিল মণ্ডল আমাদের একজন গ্রাহক। তাঁর মাধ্যমে যদি কেউ ঋণ নিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন

চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে ফিরলো সেই বাঘিনী

চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে ফিরলো সেই বাঘিনী

জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কোনো গাফিলতি চলবেনা

প্রধানমন্ত্রী জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কোনো গাফিলতি চলবেনা

বন্যায় গৃহহীন ৩০০ পরিবারকে ঘর দেবে আস-সুন্নাহ

বন্যায় গৃহহীন ৩০০ পরিবারকে ঘর দেবে আস-সুন্নাহ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App