চলনবিলে দেশি মাছের ভরা মৌসুমেও চলছে পোনা নিধন
মো. মাজেম আলী মলিন, গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বর্ষার নতুন পানিতে দেশের বৃহত্তম বিলাঞ্চল চলনবিলে ফিরতে শুরু করেছে প্রাণ। নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়াসহ বিস্তীর্ণ চলনবিল অঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির মাছের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভোর থেকে বিভিন্ন হাট-বাজারে জেলেদের মাছ নিয়ে ভিড় জমছে, প্রাণ ফিরে পেয়েছে বিলপাড়ের মাছের বাজার।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব জালে নির্বিচারে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া, কুচিয়া, শামুক, ঝিনুক, জলজ সাপসহ নানা জলজ প্রাণী ধরা পড়ছে, যা চলনবিলের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। অথচ প্রকাশ্যে এসব ছোট মাছ ও জলজ প্রাণী বিক্রি হলেও কার্যকর নজরদারি ও অভিযান তেমন চোখে পড়ছে না।
চলনবিলের বিভিন্ন এলাকার জেলেরা জানান, নতুন পানির স্রোতে বিল, নদী ও খালের সংযোগস্থলে মাছের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক দিনে টেংরা, পুঁটি, কৈ, শিং, মাগুর, গুচি, চান্দা, শোল, বোয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ছে। এতে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে জেলে পরিবারগুলোতে।
সিংড়া বাসস্ট্যান্ড মাছ বাজার, গুরুদাসপুরের চাচকৈড় বাজার, ডাহিয়া, বিলদহর, সাতপুকুরিয়া, বিয়াশ, জামতলী, তাড়াশ, চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়ার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিন শত শত পেশাদার ও মৌসুমি জেলে দেশীয় মাছ বিক্রি করছেন। সকাল থেকেই বাজারগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চলনবিলের বিলশা গ্রামের জেলে আফজাল হোসেন বলেন, “বর্ষার নতুন পানি আসার পর আগের তুলনায় জালে অনেক বেশি মাছ ধরা পড়ছে। তবে মাছের সঙ্গে ছোট পোনা ও ডিমওয়ালা মাছও উঠে আসছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয়।”
একাধিক জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, এমনকি ডিমওয়ালা মাছ ও পোনাও ধরা পড়ছে। পরে সেগুলোর একটি অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সরবরাহ বাড়লেও বাজারে মাছের দাম খুব একটা কমেনি। গুরুদাসপুরের চাচকৈড় বাজারের ক্রেতা কলেজশিক্ষক রবিউল করিম বলেন, “দেশি মাছের আমদানি বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু দাম আগের মতোই রয়েছে। তারপরও বর্ষার নতুন পানির দেশি মাছের স্বাদের কারণে কিনতে হচ্ছে।”
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাঝারি চিংড়ি প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, ছোট গুচি ৬০০ টাকা, মাঝারি গুচি ৮০০ টাকা, টেংরা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, ছোট পুঁটি ১০০ টাকা, মাঝারি পুঁটি ২০০ টাকা, কৈ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, চান্দা ২০০ টাকা, শোল ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং মাঝারি বোয়াল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের সরবরাহ বাড়ায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দইল বাজার ও মান্নাননগর, নাটোরের ডাহিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকা, পারিল ব্রিজ, বিয়াশ মাবিয়া মোড়সহ চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী পাইকারি মাছের আড়ৎ ও বাজার জমে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে কয়েক লাখ টাকার দেশীয় মাছ কেনাবেচা হচ্ছে। এসব বাজার থেকে মাছ ট্রাক ও পিকআপযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
চলনবিলের নদী ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মজনু বলেন, “বর্ষার নতুন পানিতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য চলনবিলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু একই সময়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের অবাধ ব্যবহার সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে। এই জালে নির্বিচারে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ায় দেশীয় মৎস্যসম্পদ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ছোট মাছ অনেক বাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হলেও কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। চলনবিলের জীববৈচিত্র্য, দেশীয় মাছের প্রজনন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নিয়মিত অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, চলনবিলের দেশীয় মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বর্ষা মৌসুমজুড়ে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান, পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধ এবং বাজার পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় আজকের এই মাছের প্রাচুর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই থাকবে না; বিলের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়বে।
