সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের ‘ইচ্ছাপূরণ’ প্রকল্প বাতিল হচ্ছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৪, ১১:১১ এএম
ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের ‘ইচ্ছাপূরণ’ প্রকল্প বাতিল হচ্ছে। তিনটির দিক বিবেচনা করে এসব প্রকল্প বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এক. প্রকল্পটি কতটা মানুষের প্রয়োজনে নেয়া হয়েছে। দুই. প্রকল্প থেকে রিটার্ন (সুফল) কেমন আসবে। তিন. প্রকল্পটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না। রেল, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অনেক প্রকল্প শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশে নেয়া হয়েছে। সে প্রকল্পগুলো বাতিল হবে।
সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের নির্বাচনী এলাকা রাজবাড়ীতে একটি রেল কারখানা নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। ব্যয় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি। অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পটিও বাতিল করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। রেল মন্ত্রণালয়ের এখনকার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ও নীলফামারীর সৈয়দপুরে রেলওয়ের দুটি কারখানা রয়েছে।
জনবলসংকট, কম বরাদ্দ, পুরোনো যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের অভাবে কারখানা দুটি ধুঁকছে। সে দুটির আধুনিকায়ন না করে নতুন কারখানা করার উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল। শুধু রেল কারখানা নয়; রেল, সড়ক, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি), দুর্যোগ, পরিবেশ, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া, অলাভজনক ও অগুরুত্বপূর্ণ’ প্রকল্প বাতিল করতে যাচ্ছে সরকার। ১০টি মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে অন্তত ৩৫টি প্রকল্পের খোঁজ পাওয়া গেছে, যেগুলো বাতিল, অর্থায়ন স্থগিত অথবা ব্যয় কাটছাঁট করা হবে। এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
এর আগে গত ১৯ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া এবং কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের তালিকা করতে বলেছিলেন। এই নির্দেশনার পর ভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রকল্পের তালিকা তৈরি শুরু করে। যে ৩৫টি প্রকল্প বাতিল অথবা স্থগিত হতে যাচ্ছে, সেগুলোর কোনোটির কাজ মাঝামাঝি পর্যায়ে, কোনোটির কাজ মাত্র শুরু হয়েছে, কোনোটির কাজ এখনো শুরু হয়নি। কিছু প্রকল্প অনুমোদনের পর্যায়ে ছিল।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আগ্রহে কিশোরগঞ্জে হাওরে একটি উড়ালসড়ক নির্মাণকাজ শুরু হয় গত বছর। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের অর্থায়ন স্থগিত হতে পারে। কারণ, এ উড়ালসড়ক দিয়ে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচলের কথা বলা হচ্ছে, সেই পরিমাণ যান চলাচলের সম্ভাবনা কম। হাওরে উড়ালসড়ক নির্মিত হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে। হাওরে উড়ালসড়কটি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা থেকে শুরু হয়ে করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালীতে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত বছরের জানুয়ারি মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। বাতিলের তালিকায় ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে হাওরে উড়ালসড়ক প্রকল্পের পরিচালক সারোয়ার মোর্শেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে নেত্রকোনার সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে হাওরে আরেকটি উড়ালসড়ক নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। গত ৩১ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয়, সুনামগঞ্জে উড়ালসড়ক নির্মাণ হলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলা বনে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, মৌলভীবাজার (প্রথম পর্যায়)’ শিরোনামে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছর। জুড়ী তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের নির্বাচনী এলাকা। পার্কটি হওয়ার কথা ছিল সংরক্ষিত বনের ৫ হাজার ৬৩১ একর জমিতে। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬৪ কোটি টাকা। সংরক্ষিত বনে সাফারি পার্ক নির্মাণ নিয়ে পরিবেশবাদীদের আপত্তি ছিল। পরিকল্পনা কমিশনও আপত্তি জানিয়েছিল। তারপরও প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। নতুন সরকার প্রকল্পটি বাতিল করতে যাচ্ছে।
সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী থাকার সময় (২০১৪-২০১৮) ফরিদপুর শহরের টেপাখোলায় নিজ নির্বাচনী এলাকায় একটি পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এ জন্য ২০১৮ সালে নেয়া প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ১৮০ কোটি টাকা। চলতি বছরের শুরুতে এই পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রহমান। যদিও প্রকল্পটির কাজ এখনো শুরু হয়নি। এর অর্থায়নও স্থগিত হচ্ছে।
২০১৯ সালে ১ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নির্বাচনী এলাকা নবাবগঞ্জে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের একটি প্রকল্প নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য সাজ্জাদুল হাসানের নির্বাচনী এলাকা নেত্রকোনায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের আরেকটি প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৮ সালে। ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প দুটি বাতিল হচ্ছে।
সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের নির্বাচনী এলাকা মেহেরপুরে একটি মেরিটাইম ইনস্টিটিউট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পরপরই। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। ব্যয় ধরা হয়েছিল ২২০ কোটি টাকা। এটি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় থাকা অবস্থায় বাতিল হচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম ও মাদারীপুরে দুটি মেরিটাইম ইনস্টিটিউট রয়েছে। এ দুটি ইনস্টিটিউটে জনবল ও আর্থিক সংকট রয়েছে। সে দুটিকে শক্তিশালী না করে নতুন ইনস্টিটিউট নেয়া হয়েছিল ফরহাদ হোসেনের চাপে। সংসদ সদস্যদের পছন্দ অনুযায়ী গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের একটি প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। এর ৬৮ শতাংশ অর্থ খরচ হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের গত ৩১ অক্টোবরের একটি সভায় এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার টানা তিন মেয়াদে নিজেদের করা ‘উন্নয়নকাজে’র প্রচারে গত বছর এপ্রিলে ‘প্রান্তিক পর্যায়ে উন্নয়ন প্রচার’ শিরোনামের একটি প্রকল্প নেয়। ব্যয় ধরা হয় ৪৩ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বায়োস্কোপের মাধ্যমে সরকারের ‘উন্নয়নকাজ’ মানুষকে দেখানো হতো। এর পেছনে ইতিমধ্যে ১৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রকল্পটির কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি নিয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিগত সরকার শুধু তাদের উন্নয়নই প্রচার করেছে; মানুষের কোনো উপকারে আসেনি। সে জন্য প্রকল্পটি বাতিল হচ্ছে।
প্রকল্পটির উপপ্রকল্প পরিচালক শরিফুল আরমান বলেন, উন্নয়ন প্রচার কার্যক্রম আপাতত স্থগিত আছে। দুর্যোগকালে মানুষের আশ্রয়ের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় ৫৫০টি মুজিব কিল্লা (আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের চাপে তাদের এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে, যা কাজে আসছে না। মুজিব কিল্লা নির্মাণ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, মানহীন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ প্রকল্প স্থগিত থাকবে।
ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেলের সাউদার্ন রুট প্রকল্প (এমআরটি লাইন-৫) বাতিল হতে পারে। এটি অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। সূত্র জানিয়েছে, প্রভাবশালী আবাসন ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য এই প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। এর বদলে সরকার গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রোরেল (লাইন-২) নির্মাণে জোর দিচ্ছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে চিঠি দেয় পরিকল্পনা কমিশন। চিঠিতে এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্প পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনরায় যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। বাতিল অথবা বরাদ্দ কাটছাঁটের তালিকায় ওঠা বাকি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে তিন জেলায় (ফেনী, চাঁদপুর ও টাঙ্গাইল) কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট নির্মাণ, ১২ জেলায় হাইটেক পার্ক, ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন, মোবাইল গেম অ্যাপ্লিকেশন, শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার প্রকল্প।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৩২৬টি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে নতুন প্রকল্প নিচ্ছে না। যেসব প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আসছে, সেগুলো ফেরত পাঠানো হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধন করা হবে। সংশোধিত বাজেটে অনেক অগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ পড়বে। কোনো কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করে দেয়া হবে। সরকারি উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে ফেললে কর্মসংস্থান ও পণ্যের চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে; যা পরোক্ষভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া এবং অগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাতিল করার পদক্ষেপটি সঠিক। সেই সঙ্গে সত্যিকার জনকল্যাণমুখী নতুন প্রকল্প নেয়া দরকার, যদি অর্থায়ন পাওয়া যায়। তিনি প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে বর্তমান মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় মানুষকে স্বস্তি দিতে সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তায় ব্যয় বাড়ানোর পরামর্শ দেন। এখন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বাড়ানো যেতে পারে। দরিদ্র মানুষকে নগদ অর্থ দেয়া যেতে পারে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ কেউ কারাগারে। তাই তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
