যে পাঁচ সূচকে বোঝা যাবে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:১১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ঠিক এক মাস পূর্ণ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে এক ধরনের স্থবিরতা বা শীতলতা ছিল, তাতেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার ক্ষমতায় আসে, ভারতের চোখে সেটি ছিল একটি ‘অনির্বাচিত’ সরকার, দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা ছাড়া তাদের আর কোনো ম্যান্ডেট নেই, এমন দাবিও দিল্লির পক্ষ থেকে তখন একাধিকবার করা হয়েছে।
সেই যুক্তিতেই দিল্লি ঢাকার সঙ্গে ‘এনগেজমেন্ট’ কার্যত স্থগিত রেখেছিল। গুরুত্বপূর্ণ সব দ্বিপক্ষীয় আলোচনা থমকে গিয়েছিল, হাই-প্রোফাইল সফরগুলোও বন্ধ ছিল, এমনকি দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের পথেও হেঁটেছিল।
সে সময় ভারতের ঘোষিত অবস্থান ছিল, আগে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসুক, আর সেটা যে দলেরই সরকার হোক না কেন, তাদের সঙ্গে ‘ডিল’ করতে দিল্লির কোনো আপত্তি নেই।
এখন গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যে সাধারণ নির্বাচন হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক স্তরেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং সেই ভোটে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি গরিষ্ঠতা অর্জন করে এককভাবে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।
১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রথম যে বিশ্বনেতারা ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান, তাদের মধ্যে ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। শুধু তাই নয়, সে দিন বিকেলে তিনি টেলিফোনেও তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেন।
দেড় বছরের একটি ‘পজ’ বা বিরতির অবসানে দিল্লি যে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক আবার সহজ করে তুলতে চাইছে, সেই ইঙ্গিত সে দিনই পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি দল হিসেবে বিএনপির সঙ্গে ভারতের একদা অস্বস্তিকর সম্পর্কও আপাতদৃষ্টিতে তাতে বাধা হয়নি।
কিন্তু বরফ গলার মধ্য দিয়ে নতুন করে যে সম্পর্কের যাত্রা শুরু, তা কি সত্যিই শেষমেশ প্রত্যাশিত পথে এগোবে?
ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে দু’পক্ষেরই বিপুল পরিমাণে ‘স্টেক’ বা স্বার্থ আছে, তাতে যেমন কোনো সন্দেহ নেই, তেমনি দুই দেশের রাজনীতিতেই অন্য দেশের গভীর ছায়াপাতও একটি বাস্তবতা।
অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন ‘ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর’ এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, তেমনি ভারতের রাজনীতিতে, বিশেষ করে পূর্ব সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে—বাংলাদেশও বরাবরই একটি আলোচিত ও প্রাসঙ্গিক ইস্যু।
ফলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা—নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতা—কোন বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বেশি প্রভাব ফেলবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগামী দিনে কোন পথে যেতে পারে, তা কয়েকটি নির্দিষ্ট সূচক দিয়ে পরিমাপ করা যেতে পারে।
আরো পড়ুন : ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চাপ বাড়লেও নেই যানজট
পরবর্তী কয়েক মাসে এরকম পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বা লক্ষণ কী হতে পারে, তারই বিশদ তুলে ধরা হলো—
ভিসা কার্যক্রম কি স্বাভাবিক হবে?
ভারতে বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। কোভিড মহামারির আগের বছরেও চিকিৎসা, পর্যটন, ব্যবসা বা কেনাকাটার জন্য প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি ভারতে গিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ভারত বাংলাদেশে ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দিলে সেই সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। গত দেড় বছরে কেবল কিছু মেডিকেল, জরুরি ও সীমিত ‘ডাবল এন্ট্রি’ ভিসা দেওয়া হয়েছে।
তবে সম্প্রতি ভারতীয় কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হবে এবং পর্যটন ভিসাও চালু করা হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে সম্পর্ক উন্নয়নের বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হবে।
তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোথায়?
নতুন সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর তার দেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নির্দেশ করে। তারেক রহমান যদি প্রথম সফরে দিল্লি যান, তাহলে বোঝা যাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তার সরকার আগ্রহী। অন্যদিকে তিনি সৌদি আরব, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, নেপাল, শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানে গেলে সেটিও ভিন্ন বার্তা দেবে।
এছাড়া তিনি যদি নিজে ভারত সফরে না গিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানান, সেটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।
ভারতের ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফরে যাবে?
২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের বাংলাদেশ সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছিল, যা মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এখন ২০২৬ সালের জুনে সেই সফর পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। ভারত যদি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে, তাহলে তা সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক ইঙ্গিত দেবে।
কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি হবে?
গত দেড় বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস, বন্ধন এক্সপ্রেস ও মিতালি এক্সপ্রেস চলাচল বন্ধ আছে।
আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগ প্রকল্পও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে, যদিও এর বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে।
এই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।
গঙ্গা জল চুক্তির নবায়ন কবে?
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা জল চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। বর্তমানে কেবল কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলছে, তবে রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। সময়মতো চুক্তি নবায়ন না হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। যদি দ্রুত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়, তাহলে বোঝা যাবে দুই দেশই সম্পর্ক উন্নয়নে আন্তরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। সব মিলিয়ে, এই পাঁচটি সূচকই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেবে।
