×

জাতীয়

কর্নেল ওসমানী যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠেছিলেন

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম

কর্নেল ওসমানী যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠেছিলেন

মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। ছবি : সংগৃহীত

রাজনৈতিক সমঝোতার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় নির্বিচারে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সেই সামরিক অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাঙালি জাতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

এই যুদ্ধের প্রারম্ভে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি সেনারা বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকেন। এপ্রিলের শুরুতে তারা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকেন এবং গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী।

এই বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। সৈন্যদের কাছে ‘পাপা টাইগার’ নামে পরিচিত ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের তিন বছর আগেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলেন এবং পরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

রাজনীতি থেকে আবার সামরিক নেতৃত্বে ফিরে এসে কীভাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠলেন—তারই বিস্তারিত বর্ণনা এখানে তুলে ধরা হলো।

১৯১৮ সালে সুনামগঞ্জের একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এম এ জি ওসমানী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তার বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ব্রিটিশ শাসনামলে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। বাবার চাকরির কারণে শৈশব কাটে আসাম ও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে। স্কুল ও কলেজ জীবন শেষ করে তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৩৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্নাতক শেষে তিনি একই সঙ্গে দুটি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন—একটি ছিল সিভিল সার্ভিস এবং অন্যটি সেনাবাহিনীর। উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সামরিক জীবনকেই বেছে নেন এবং ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার দুই বছরের মধ্যেই তিনি মেজর পদে উন্নীত হন এবং একটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে বার্মায় পাঠানো হয়।

আরো পড়ুন : সময়ের অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত আমার স্বাধীনতার গৌরব!

যুদ্ধ শেষে ১৯৪৭ সালে তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়। দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের অতিরিক্ত কমান্ড্যান্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং পরবর্তী এক দশক সামরিক সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন। ১৯৬৭ সালে কর্নেল পদেই অবসর গ্রহণ করেন তিনি।

গবেষকদের মতে, তার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাঙালি হওয়ার কারণে তিনি উচ্চপদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পাননি, যা ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক কাঠামোর বৈষম্যের একটি উদাহরণ। অবসর নেওয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সিলেট অঞ্চলের একটি আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পরও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলে দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হয়। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে আন্দোলন নতুন গতি পায়। এই সময় ২২শে মার্চ ঢাকার বায়তুল মোকাররমের সামনে অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সেনাদের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ওসমানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেখানে সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্যরা দেশের প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। এরপর তারা শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং স্বাধীনতার জন্য শপথ নেন। পরে ওসমানীসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে তাকে একটি তরবারি উপহার দেওয়া হয়।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় ওসমানী গোপনে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠিত করতে থাকেন। এতে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে এবং সম্ভাব্য বিদ্রোহের আশঙ্কা করে। ২৫শে মার্চের গণহত্যার পর সারা দেশে প্রতিরোধ শুরু হয়। এই বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একত্রিত করার লক্ষ্যে ৪ঠা এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এই বৈঠকেই ‘তেলিয়াপাড়া রণকৌশল’ প্রণয়ন করা হয়। ওসমানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তারা অংশ নেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে তাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে নির্বাচিত করেন। বাংলাদেশকে কয়েকটি সামরিক অঞ্চলে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত হয়। এছাড়া একটি অস্থায়ী সরকার গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা অর্জনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১০ই এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ই এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে। এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ওসমানীকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তার সামরিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ, আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তাকে এই পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত করে তোলে। সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি মুক্তিবাহিনীকে নিয়মিত ও অনিয়মিত—এই দুই ভাগে বিভক্ত করেন। নিয়মিত বাহিনীতে ছিল প্রশিক্ষিত সৈন্যরা, আর অনিয়মিত গণবাহিনীতে যুক্ত হয় সাধারণ মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। তাদের গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এই সংগঠিত নেতৃত্ব ও কৌশলের মাধ্যমে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর এম এ জি ওসমানী সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

এনসিপির আহ্বায়কসহ শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ

এনসিপির আহ্বায়কসহ শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ

প্রীতি ফুটবল ম্যাচ দেখতে মেয়ে জাইমাকে নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী

প্রীতি ফুটবল ম্যাচ দেখতে মেয়ে জাইমাকে নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী

মহম্মদপুরে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালিত

মহম্মদপুরে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালিত

কুয়াকাটায় পালিত হয়নি মহান স্বাধীনতা দিবস

কুয়াকাটায় পালিত হয়নি মহান স্বাধীনতা দিবস

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App