মাদক পাচার দমনে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চুক্তি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৭:১২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী গত ৮-৯ মে দু’দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করেন। সফরকালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে মাদক পাচার প্রতিরোধ, মাদকের অপব্যবহার রোধ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই সমঝোতাকে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমঝোতা সইয়ের বিষয়ে জানিয়েছে, ‘পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী মহসিন নাকভী ঢাকায় বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।’
এদিকে,মাদক পাচার প্রতিরোধ, অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকদ্রব্য দমনে সহযোগিতা জোরদার করতে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পাকিস্তান সরকারের পক্ষে ফেডারেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী স্বাক্ষর করেন।
এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় উভয় দেশ মাদকদ্রব্যের অবৈধ পরিবহন ও চোরাচালান প্রতিরোধে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। বিশেষ করে সমাজে মাদকাসক্তির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নির্মূল করতে যৌথ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া অবৈধ মাদক সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) এবং পাচারকারী নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত ও কার্যকর কৌশল তৈরি করবে দুই দেশ।
চুক্তির অন্যতম প্রধান দিক হলো গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়। উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাদক পাচারকারী এবং অপরাধী চক্র সম্পর্কে সময়োপযোগী তথ্য আদান-প্রদান করবে। পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে নিয়োজিত কর্মীদের পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সর্বোত্তম কর্মপন্থা (Best Practices) বিনিময়ের বিষয়টিও এই সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
উভয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সচিব-পর্যায়ের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হন।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পে বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দেন এবং বলেন, এই উদ্যোগের বিষয়ে পাকিস্তান বাংলাদেশ সরকারকে সম্ভাব্য সব উপায়ে সমর্থন করবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত পোষণ করেন। এসময় সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই এবং মানব পাচার প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যৌথ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধ এবং আর্থিক জালিয়াতি মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব বাড়াতে পুলিশ একাডেমিগুলোর মধ্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ায় মহসিন নাকভীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকের বিষয়ে জানানো হয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
উভয় দেশের মন্ত্রী আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিন্ন স্বার্থের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং বিচারিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে দুই দেশ একমত পোষণ করে।
মানবপাচার এবং অভিবাসীদের অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং পাচারকারী চক্র দমনে যৌথ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়।
ফৌজদারি অপরাধের তদন্তে দ্রুত তথ্য ও সাক্ষ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটারস’ চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। এর ফলে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা আরো সুদৃঢ় হবে। এ ছাড়া অপরাধীরা যাতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে বিচার এড়াতে না পারে, সেজন্য সন্ত্রাসবাদ ও আর্থিক অপরাধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা নিয়ে কথা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে আধুনিক পুলিশিং ও অপরাধ তদন্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। বিশেষ করে সাইবার অপরাধ এবং সংঘটিত অপরাধ দমনে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন দুই মন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন বৃদ্ধির আহ্বান জানান। এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে গঠনমূলক আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে পাকিস্তান ভূমিকা রাখতে পারে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, চোরাচালান এবং দলিলাদি জালিয়াতি রোধে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে একটি খসড়া চুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশ বর্তমানে এই খসড়াটি পর্যালোচনা করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুপারিশকৃত তিনজন পাকিস্তানি বন্দির মুক্তির বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো নথির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও এ সময় আলোচনা হয়।
বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দারসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
