সরকারের ভেতর ‘কিচেন কেবিনেট’ কী, বাংলাদেশে কেন আলোচনায়?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি শব্দ ‘কিচেন কেবিনেট’। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বক্তব্যের পর এই শব্দটি ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল, আলোচনা ও বিতর্ক।
মূলত সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় একটি অনানুষ্ঠানিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ থেকেই বিষয়টি সামনে আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত এমন একটি বলয়কে বোঝানো হয়, যারা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে।
‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটির উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে, বিশেষ করে ১৮৩০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সময়কালেই এই ধারণার জন্ম হয়। সে সময় জ্যাকসন তার আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু, রাজনৈতিক সহযোগী এবং সাংবাদিকদের পরামর্শের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতেন বলে সমালোচনা তৈরি হয়। অভিযোগ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি নিয়মিতভাবে সরকারি মন্ত্রীদের বাইরে থাকা এই অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
এই অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বলয়ের সদস্যরা হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ না হলেও প্রেসিডেন্টের নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতেন। তারা অনেক সময় সরকারি বৈঠকের বাইরে, ব্যক্তিগত পরিবেশে বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের রান্নাঘর বা অনানুষ্ঠানিক কক্ষে আলোচনায় অংশ নিতেন।
এই পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গ করে সমালোচকেরা তাদের ‘কিচেন কেবিনেট’ নামে অভিহিত করতে শুরু করেন। কারণ তারা আনুষ্ঠানিক “কেবিনেট” বা মন্ত্রিসভার বাইরে থেকেও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং অনেক সময় তাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের আলোচনাগুলো ছিল অনানুষ্ঠানিক ও গোপনীয়।
আরো পড়ুন : ‘কিচেন কেবিনেট ছিলো, আমি এর সদস্য ছিলাম না’
পরবর্তীতে এই শব্দটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এটি বিশ্ব রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি সাধারণ রাজনৈতিক পরিভাষায় পরিণত হয়। এখন ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে বোঝানো হয় এমন একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী উপদেষ্টা গোষ্ঠীকে যারা রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের খুব ঘনিষ্ঠ থেকে নীতিনির্ধারণে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে, যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দায়িত্বে নাও থাকতে পারে।
বাংলাদেশে বিষয়টি আলোচনায় আসে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের পর। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো একটি ‘সাত সদস্যের প্রভাবশালী অনানুষ্ঠানিক বলয়’ থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। তার ভাষ্যমতে, এই গোষ্ঠী প্রতি মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় বৈঠকে বসত এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নির্ধারণ করত। তিনি আরো অভিযোগ করেন, অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ওই বলয়ের মতামতকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হতো।
তৌহিদ হোসেন জানান, নিজের মন্ত্রণালয়ে অন্যদের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারে তিনি এতটাই বিরক্ত ছিলেন যে তিনবার পদত্যাগের কথাও ভেবেছিলেন। তবে সরকারের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত তা করেননি।
অন্যদিকে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ সক্রিয় থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। যদিও তিনি দাবি করেন, নিজে ওই বলয়ের সদস্য ছিলেন না। এর আগে সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্যেও এমন একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।
সব মিলিয়ে, ‘কিচেন কেবিনেট’ এখন শুধু একটি রাজনৈতিক শব্দ নয় বরং অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
