প্রতি ডিমে ৪ টাকা লোকসান প্রান্তিক খামারিদের, মাসে ৫০০ কোটি
মীম ওবাইদুল্লাহ
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১০:০৫ পিএম
ছবি: ডিমের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণমসহ বিভিন্ন দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবে বিপিআইএ’র সংবাদ সম্মেলন
মাত্র চার বছর আগে অনেক স্বপ্ন নিয়ে পোল্ট্রি খামার শুরু করেছিলেন রাজিব। ভেবেছিলেন, নিজের একটি স্থায়ী আয়ের উৎস হবে, পরিবারের ভবিষ্যৎও নিরাপদ হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। খামারে এখনও ২২০০টি মুরগি থাকলেও প্রতিদিন তাকে গুনতে হিচ্ছে লোকসানের হিসাব।
খামার থেকে উৎপাদিত ডিম বিক্রি করেও প্রতিদিন তার লোকসান হচ্ছে আড়াই হাজার টাকার বেশি। সেই হিসাবে মাস শেষে ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। গত ছয়-সাত মাস ধরে টানা এই লোকসান গুনছেন তিনি।
রাজিব বলেন, আত্মীয়-স্বজন, ব্যাংক, এমনকি বীমা প্রতিষ্ঠান—যেখান থেকে সম্ভব হয়েছে, সেখান থেকেই ঋণ নিয়ে খামারে বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু এখন এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে না পারছেন খামার ছেড়ে দিতে, না পারছেন লোকসান মাথায় নিয়ে এটি চালিয়ে যেতে।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার স্বরূপকাঠির বাসিন্দা রাজিবের এই সংকট অবশ্য একার নয়। তার গ্রামের প্রায় ৪০০ পরিবার পোল্ট্রি খামারের সঙ্গে জড়িত। ডিমের উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারমূল্য কম থাকায় প্রায় প্রত্যেক খামারিই একই ধরনের আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত, কেউ কেউ খামার বন্ধ করার কথাও ভাবছেন।

নিজের অসহায় অবস্থার কথা বলতে গিয়ে রাজিব জানান, গত কয়েক মাসে একটি ব্যাংক থেকে নিজের নামে ৭ লাখ টাকা এবং আরেকটি ব্যাংক থেকে বন্ধুর নামে আরও সাড়ে ৬ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এর বাইরে এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, যার কাছে ধার করতে হয়নি। কণ্ঠে হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, “হয়তো আর এক-দুই মাস দেখব। এরপরও যদি ডিমের দাম না বাড়ে, তাহলে কোনো এক রাতে নিরুদ্দেশ হতে হবে। এছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। মাসের পর মাস এভাবে লোকসান বহন করার সামর্থ্য আমার আর নেই।”
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রাজিব। এদিন উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে ডিমের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, দেশের সব পোলট্রি খামারিদের নিয়ে ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি এবং প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)।
এদিন বেলা ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে সংগঠনটি। এ সময় প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে পথচারিদের সিদ্ধ ডিম বিতরণ করেন সারাদেশ থেকে আগত খামারিরা। পরে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী হলে সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ প্রায় সাড়ে ১০ টাকা হলেও বিক্রয়মূল্য সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ টাকা। ফলে প্রতিটি ডিমে ৪ টাকা লোকসান হচ্ছে। যদিও ভোক্তা পর্যায়ে ডিমের দাম ১০ টাকার বেশি। এতে প্রতিটি ডিমে ৪ টাকা হিসাবে প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন দেশের তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারীরা। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই বছরের মধ তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা টিকে থাকবে না, সব ঝরে পড়বে। এতে পুরো পোল্ট্রি খাত চলে যাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে। এর ফলে সহজলভ্য প্রোটিনের বড় উৎস ডিম কিনে খেতে হবে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ দামে। কর্মসংস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ।
মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে মাছ, মুরগির বাচ্চা, ওষুধ, টিকা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। তবে সেই অনুপাতে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে পোলট্রি–শিল্পের মূল চালিকা শক্তি প্রান্তিক খামারিরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। গত ৫ বছরে ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন। আবার এই খাতে করপোরেট কর ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, যদিও প্রতিযোগী দেশগুলোতে তা আরও কম বলে জানান তিনি।
তাই সংগঠনটির পক্ষ থেকে ধান ও আখের মতো ডিমের ক্ষেত্রেও ন্যায্যমূল্য বা ‘ফেয়ার প্রাইস’–ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানানো হয়। তাদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এমন মূল্য নির্ধারণ করা, যাতে খামারিরা ন্যূনতম মুনাফা পেয়ে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন।
জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল পোলট্রি ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে। বিপিআইএর দাবি, এর মাধ্যমে প্রকৃত খামারির সংখ্যা, উৎপাদন, চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত তথ্য পাওয়া যাবে। পাশাপাশি প্রকৃত খামারিদের কাছে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে ঋণ পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাফির রহমান বলেন, ‘খামারিদের ৭০-৮০ শতাংশ ব্যয় চলে যায় খাদ্যের পেছনে। তার সঙ্গে খাদ্যের উপকরণ আমদানিতে আছে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর; আমরা এটা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছি। বাংলাদেশ ছাড়া আর কোন দেশে কাঁচামালে এমন কর নেই।’
কর্মসূচিতে প্রান্তিক খামারিরা বলেন, ‘আমরা কোনো ভর্তুকিনির্ভর শিল্প চাই না; আমরা চাই একটি মুক্ত, স্বচ্ছ ও টেকসই বাজার ব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পাবেন, ভোক্তা সাশ্রয়ী দামে নিরাপদ খাদ্য পাবেন এবং দেশ খাদ্য নিরাপত্তায় আরও শক্তিশালী হবে।
খামারিরা জানান, দেশের হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন তারা লোকসান গুনছেন, ক্রমে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন—এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে ভোক্তাদেরও বেশি মূল্য দিতে হবে।
তারা আরও জানান, ফিড, বাচ্চা, ঔষধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন—প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের মূল্য বেড়েছে; কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে খামারিরা প্রতিনিয়ত লোকসানের বোঝা বহন করছেন। এই দীর্ঘ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং খামারিদের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
খামারিরা উপজেলা পর্যায়ে ডিম সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা, স্বল্পসুদে সহজশর্তে ঋণ, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি, নিয়মিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব কমাতে কার্যকর বাজার তদারকির দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিপিআইএ’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার, উপদেষ্টা এন সি বণিক, সহসভাপতি মেজবাউর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, প্রচার সম্পাদক সফিকুর রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক গাজী নূর হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুন্না মুন্সী।
