হঠাৎ এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে ভোগান্তি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির একটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, শিল্প-কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ গ্রাহকরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, টার্মিনাল চালু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বুধবার সকালের মধ্যে বন্ধ থাকা এফএসআরইউ চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে তিতাস গ্যাস কোম্পানির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, একটি এফএসআরইউ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাইপলাইনে মজুত থাকা গ্যাস সোমবারের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে প্রকৃত সংকট বুধবার থেকেই শুরু হবে। তাঁর মতে, টার্মিনাল চালু হলেও আগামী শুক্রবারের আগে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মঙ্গলবার সকালে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলেরেট এনার্জির পরিচালিত এফএসআরইউ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। সাধারণ সময়ে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এই ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্যাসের ঘাটতির কারণে পিডিবির জন্য বরাদ্দ ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কমানো হয়েছে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সময়ে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। সব মিলিয়ে রাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকট ও রামপাল কেন্দ্র বন্ধ থাকায় দেশে ২৫০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, চলমান বৃষ্টির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকলেও লোডশেডিং এড়ানো সম্ভব হয়নি।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাস সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পড়েছে। অনেক শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকাতেও স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, বুধবারের মধ্যে এফএসআরইউ চালু হলে সংকট কিছুটা কমতে পারে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে দুটি এফএসআরইউ থেকে আসে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট।
এদিকে গ্যাস বিক্রিতে কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে ৩০ জুলাই ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। দাবি পূরণ না হলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশব্যাপী সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখারও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন সংগঠনের স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান চৌধুরী।
তিনি বলেন, কমিশন বৃদ্ধি না হলে ৩০ জুলাই দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকবে। এ সময় সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলবে। এরপরও দাবি আদায় না হলে ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হবে।
সংগঠনের নেতারা জানান, ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ১১ বছরে মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রাংশ, ব্যাংক কমিশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমির ইজারা এবং বিভিন্ন সরকারি লাইসেন্স ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বর্তমান কমিশনে ফিলিং স্টেশন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, প্রতি ঘনমিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা নির্ধারণ করতে হবে, অর্থাৎ ৫ টাকা ৯৬ পয়সা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে গ্যাসের মূল্য বাড়লে কমিশনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
