×

জাতীয়

টুথপেস্টের পর সয়াবিন তেলেও মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম

টুথপেস্টের পর সয়াবিন তেলেও মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

ছবি : সংগৃহীত

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বোতলজাত ও খোলা উভয় ধরনের সয়াবিন তেলেই উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পেয়েছেন। বিশেষ করে বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর একদল গবেষক যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় তেলের নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এলডিপিই), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি), পলিইউরেথেন (পিইউ) এবং নাইলন।

গবেষকদের মতে, খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন সুপারশপ এবং খোলা বাজার থেকে সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে আধুনিক রাসায়নিক ও স্পেকট্রোস্কোপিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নমুনাগুলোর বিশ্লেষণ করা হয়।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে, যা বোতলজাত তেলের তুলনায় প্রায় ১.২৪ গুণ বেশি। তেজগাঁও এলাকার খোলা তেলের নমুনায় দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষকদের ধারণা, শিল্পকারখানার ঘনত্ব, প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল শিল্পের নিকটবর্তী অবস্থান এবং একই পাত্র বারবার ব্যবহার করে খোলা তেল সংরক্ষণ ও বিক্রির কারণে দূষণের পরিমাণ বেড়ে থাকতে পারে।

গবেষণায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ৮২.৫ শতাংশই ছিল ফাইবার বা আঁশজাতীয়। রঙের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে স্বচ্ছ প্লাস্টিক, যার হার ৫৬.২৯ শতাংশ। এছাড়া ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণার পরিমাণ ছিল ৩৫.৮৪ শতাংশ।

ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (এফটিআইআর) বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতিকে গবেষকেরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাদের দাবি, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতির তথ্য বিশ্বে প্রথমবারের মতো এই গবেষণার মাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে।

গবেষণা দলের প্রধান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, ঢাকার বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডেড ও খোলা—উভয় ধরনের সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, এসব কণার মধ্যে ফাইবার ও ভাঙা প্লাস্টিকের অংশের আধিক্য সবচেয়ে বেশি।

দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের একটি সম্ভাব্য হিসাবও প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে ১৭.৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।

অন্যদিকে শরীরের ওজন তুলনামূলক কম হওয়ায় শিশুরা প্রতিদিন গড়ে ৭৭.২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে।

লাইফটাইম এক্সপোজারের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের একটি শিশু জীবদ্দশায় প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদে কোষের ক্ষয় হতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল অতিক্রম করে রক্তপ্রবাহে প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, বর্তমানে মাইক্রোপ্লাস্টিককে একটি ‘উদীয়মান দূষক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বিপাকীয় কার্যক্রম, হরমোনের ভারসাম্য এবং প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষকদের মতে, দেশে খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য এখনো কার্যকর নীতিমালা কিংবা নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিক দূষণের প্রকৃত মাত্রা ও এর প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা সয়াবিন তেল উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মানসম্মত খাদ্যোপযোগী ফিল্টার ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।

ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় প্লাস্টিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) ব্যবস্থা আরও উন্নত করা জরুরি।

গবেষকদের ভাষ্য, ভোজ্যতেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি কেবল পণ্যের গুণগত মানের বিষয় নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্লাস্টিক দূষণের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করে তা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এর আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-র এক বছরের গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টিতে, অর্থাৎ ৭৬.৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা পাওয়া যায় মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেলে। এছাড়া ক্লোজআপ, কোদোমো, সিগন্যাল, পেপসোডেন্ট, হিমালয়া ও সেনসোডাইনসহ কয়েকটি পরিচিত ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

শিশুদের জন্য বাজারজাত ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। তবে প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি এবং কোদোমো অরেঞ্জ টুথপেস্টে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

জুলাই আন্দোলনে ৭.৬২ মিমি গুলি ব্যবহার নিয়ে যা বললেন তথ্য উপদেষ্টা

জুলাই আন্দোলনে ৭.৬২ মিমি গুলি ব্যবহার নিয়ে যা বললেন তথ্য উপদেষ্টা

হোয়াটসঅ্যাপে নতুন ফিচার, অ্যাপ ছাড়াই ওয়েব ব্রাউজারে কলিং সুবিধা

হোয়াটসঅ্যাপে নতুন ফিচার, অ্যাপ ছাড়াই ওয়েব ব্রাউজারে কলিং সুবিধা

সাগরে ৩৬ দিন ভেসে থাকা বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করল বাংলাদেশি জেলেরা

সাগরে ৩৬ দিন ভেসে থাকা বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করল বাংলাদেশি জেলেরা

বিসিবির গুরুত্বপূর্ণ  বোর্ড সভা আজ

বিসিবির গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড সভা আজ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App