সরকারি সব কমিটি থেকে ‘আওয়ামীপন্থীদের’ বাদ দেওয়ার নির্দেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, সংস্থা ও জেলা পর্যায়ে গঠিত সব কমিটি পুনর্গঠন করছে সরকার। এসব কমিটি থেকে আওয়ামীপন্থীদের সরিয়ে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে পুনর্গঠিত কমিটিতে তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সদস্য হিসেবে রাখতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন হবেন নারী।
গত ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে থেকে পাঠানো এক অফিস স্মারকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হলেও কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে মাঠ প্রশাসনে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আওয়ামী লীগ সম্পৃক্তদের বাদ দেওয়ার নির্দেশের কথা জানা গেছে।
পাশাপাশি স্মারকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, সংস্থা ও জেলা পর্যায়ে গঠিত বিদ্যমান সব কমিটি পুনর্গঠন ও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সভাপতিত্বে ৯৮টি কমিটি পুনর্গঠন করতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক আশরাফুল ইসলামের সই করা চিঠিতে বলা হয়, সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা ও বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি রয়েছে। অধিকাংশ কমিটি কয়েক বছর আগে গঠিত হয়েছে। আবার কিছু কিছু কমিটির প্রজ্ঞাপন ও কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে বিদ্যমান সব কমিটি পুনর্গঠন ও হালনাগাদ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি পাওয়ার পর অনেক জায়গায় সরকারি কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলো থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে বা অনেকেই নিজে থেকেই নিষ্ক্রিয় হয়েছে গেছেন।
ধান সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি, জেলা কৃষি উন্নয়নবিষয়ক কোর কমিটি, সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি, জেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি, আম সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সংক্রান্ত কমিটি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিসহ অনেক কমিটিতে স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নেতৃত্বে দেন। আর এসব কমিটিতে স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এর মধ্যে দলীয় পদধারী ব্যক্তিদের সঙ্গে সুশীল সমাজের অনেককেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুনর্গঠিত কমিটিতে স্থানীয় পর্যায়ের তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে—এর মধ্যে অন্তত একজন নারী—মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায়।
চিঠিতে বলা হয়, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি রয়েছে। বিদ্যমান এসব কমিটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ কমিটি বেশ কয়েক বছর আগে গঠিত হয়েছে। এছাড়া কিছু কমিটির প্রজ্ঞাপন ও কার্যক্রম সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে এসব কমিটি পুনর্গঠন করে হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
চিঠিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংযুক্ত তালিকায় থাকা ৯৮টি কমিটিসহ মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার আওতায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য বিদ্যমান সব কমিটি হালনাগাদ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানাতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে একজন সচিব ও দুজন জেলা প্রশাসক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি কমিটিতে তাদের মনোভাবের ব্যক্তিদের রাখা হয়েছিল। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর অনেকে আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে চলে গেছেন। কমিটির সভায় তারা থাকতে পারছেন না। আবার কোথাও কোথাও কমিটির বৈঠতে তাদের ডাকা হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য, এসব কারণে পুরোনো কমিটি বহাল রেখে সরকারি কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজেই নতুন বাস্তবতায় কমিটিগুলো পুনর্গঠন করে কার্যক্রম সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একজন জেলা প্রশাসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির’ কথা বললেন। তিনি বলেন, তার জেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি পদে যিনি আছেন, তাকে সভায় ডাকা হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সে জন্য এ কমিটি আশু পুনর্গঠন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এছাড়া সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এসব কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের মনোভাবের সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মেলে না। তাদেরও এখন এসব কমিটি থেকে সরানো হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত তালিকায় ৯৮টি কমিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসিরা। এসব কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি, জেলা কৃষি উন্নয়নবিষয়ক কোর কমিটি, জেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি, ধান সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি, ফলদ বৃক্ষরোপণ পক্ষ ও ফল প্রদর্শনী উদ্যাপন কমিটি, আম সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ–সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন ডিসিরা।
জেলা প্রশাসকেরা বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি, ওএমএস ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভাপতি। জেলা যুব উন্নয়ন কমিটি, যুব সংগঠনকে অনুদান দেওয়ার আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটি, ক্রীড়াবিদদের ভাতা প্রদান-সংক্রান্ত কমিটি এবং জাতীয় যুব পুরস্কার-সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভাপতিও ডিসিরা।
নতুন করে গঠিত প্রতিটি কমিটিতে স্থানীয় পর্যায়ের তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকা বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতি বা আহ্বায়ক এ তিনজনকে মনোনয়ন দেবেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব আরও কার্যকর করার কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে।
বুধবার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের এক জেলা প্রশাসক টেলিফোনে বলেন, ‘নির্দেশনার আলোকে এ সংক্রান্ত কাজ চলছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাধারণত সরকার পরিবর্তন হলে পুরোনো কমিটিগুলো পুনর্গঠন হয়, এটাই স্বাভাবিক। এবার গণঅভ্যুত্থানের মতো ঘটনা হওয়ায় বেশিরভাগ কমিটি থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই সরে গেছেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘কোথাও যেন অসতর্কতাবশতও বিতর্কিত লোকজন সদস্য হিসেবে না থাকে, তা নিশ্চিত করতেই উচ্চপর্যায় থেকে এ নির্দেশনা এসেছে। আমরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
