প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর বেঁধে দেওয়া অগণতান্ত্রিক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রস্তাবকে অগণতান্ত্রিক বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে কেউ কেউ মত দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব বা চিন্তা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত এসেছে।
তিনি বলেন, বৈঠকে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন এবং কিছু রাজনৈতিক পরামর্শও দিয়েছেন। তারা বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সংবিধান সংশোধন কমিটির আলোচনার দরজা সবার জন্য খোলা রয়েছে।
বিরোধী দলকে আলোচনায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি তাদের কমিটিতে প্রতিনিধি দেওয়ার, আলোচনায় অংশ নেওয়ার এবং মতামত জানানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই অংশগ্রহণমূলক সংবিধান সংশোধন করা সরকারের লক্ষ্য।
বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না—এমন প্রশ্ন উঠেছে। দেশের সংবিধানে বাংলাদেশকে একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এখানে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেই। এ বাস্তবতায় বর্তমান সংসদ কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না, সে বিষয়েও মত এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। সে অনুযায়ী সরকার এগোতে চায়। তবে এ বিষয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব সংসদে এলে সরকারি দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল তা বিবেচনা করবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে, কাদের নিয়ে এবং কোন প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কিছু বিষয়ে ভিন্নমতও আছে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো নিয়ে সবাইকে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা করার কথাও বলা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কেউ সংবিধানের প্রস্তাবনা পরিবর্তনের কথা বলেছেন, আবার কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো নিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিরোধী দল আলোচনায় এলে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণয়ন ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সরকার সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করতে চায়। তবে বিরোধী দলের কোনো বিষয়ে ভিন্ন মত থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। এজন্য তাদের আলোচনায় আসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো ব্যক্তি ভালো কাজ করলে জনগণ চাইলে তাকে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে পারে—এটি জনগণের অধিকার।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় তাদের দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নিয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দলের চেয়ারম্যান হিসেবে এসব প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এ অবস্থান থেকে সরকার সরে আসেনি।
তিনি আরও বলেন, সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব এলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে বর্তমানে সরকার তার অবস্থানেই রয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বাদ পড়া পাঁচটি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ মুহূর্তে বাকি সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন আলোচনায় আনার সুযোগ নেই।
তবে জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার চাইলে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করে মতামত নিতে পারে বলে জানান তিনি।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করে এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি করবে না।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, সাংবিধানিক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করা।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে অবশ্যই যুক্ত রাখতে হবে।
তার মতে, জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে আলোচনায় এনে তাদের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
এ ছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ বলেন, সংবিধান সংশোধন এমনভাবে করা উচিত, যাতে দীর্ঘমেয়াদে তা কার্যকর থাকে এবং বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন না হয়।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। আর যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করার কথা রয়েছে।
টকশো ব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত বলেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বৈঠকে বিভিন্ন মতামত এসেছে।
তিনি বলেন, কমিটি আরও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করবে। উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে এর প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং দেশের জন্য এর কার্যকারিতা—সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
বৈঠকে একজন বক্তা মত দিয়েছেন, উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে এবং স্বাধীন নাগরিক সমাজ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই নির্দলীয় নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা এবং নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের বিষয়গুলোতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে বড় ধরনের মতভেদ না থাকলেও প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। সরকারের অবস্থান সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংশোধনের দিকে, আর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় সংবিধান ফিরিয়ে নেওয়া এবং রাষ্ট্রধর্মের বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়েছে।
উচ্চকক্ষ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া অধিকাংশের মত ছিল, বর্তমান বাস্তবতায় এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় এবং নাগরিক সমাজের দলীয়করণের আশঙ্কার কথাও আলোচনায় এসেছে।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সংবিধান সংশোধন নিয়ে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, নারী নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের পর্যায়ক্রমে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন আরটিভির বার্তাপ্রধান ইলিয়াস হোসেন, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর একরামুল হক সায়েম, চরচা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসানসহ সংশ্লিষ্টরা।
কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মো. নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মো. মাহমুদুল হক রুবেলও বৈঠকে অংশ নেন।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
