ভর্তুকি কমাতে বেপরোয়া সিদ্ধান্ত
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রাজনৈতিক নেতা, ভোক্তাঅধিকারকর্মী ও অংশীজনদের বিরোধিতার পরেও দেশে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। দুই বছরের মাথায় এই দাম বাড়াল সরকার। সাধারণ গ্রাহকের খরচ বাড়ছে ১৬.৬৮ শতাংশ বা প্রতি ইউনিট ১ টাকা ৫২ পয়সা। আর পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ বা প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের দাম এখন থেকে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এবং পাইকারি বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ৮ টাকা ৩৯ পয়সা হলো। দাম বাড়ানো হয়েছে সঞ্চালন পর্যায়েও। চলতি জুন মাস থেকেই কার্যকর হবে বিদ্যুতের বাড়তি দাম। তবে গ্রাহক শ্রেণিভিত্তিক বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত থাকছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর রমনায় বিইআরসির সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের মূল্যহার ঘোষণা করেন কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমানো এবং ক্রয় ও আমদানি ব্যয়, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়, পাইকারি পর্যায়সহ সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে মূল্য বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
অর্থনৈতিক সংকটের মুখে একদিকে কর্মসংস্থানের অভাবে পিষ্ট, অন্যদিকে দামবৃদ্ধির যাঁতাকলে থাকা দেশের সাধারণ মানুষের ওপর আরো এক কশাঘাত বিদ্যুতের এই দ্বিমুখী মূল্যবৃদ্ধি। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও পরিবহন খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জনজীবনে। সংকটে পড়বে জীবন-জীবিকা। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্যাপাসিটি চার্জের দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গণশুনানিতে নাগরিকদের তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেয়া জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রহসন বলেও মন্তব্য করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে একসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এটি শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং বাজারে নতুন করে পণ্যের দামের অস্থিরতা তৈরি করবে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারকে অবিলম্বে বাজার তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বহুমুখী সংকটের মুখে জনজীবন : বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মিল-কারখানার উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে যাবে। চাল, ডাল, তেলসহ প্যাকেটজাত সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়লে ব্যবসায়ীরা তা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন। ফলে বাজারে নতুন করে দাম বাড়ার প্রবণতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
যদিও ডিজেলের দাম বাড়েনি, তবে পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ায় প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং রাইড শেয়ারিং সেবার খরচ তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ে গেছে। এর অজুহাতে গণপরিবহনগুলোতেও ভাড়া বাড়ানোর সুপ্ত প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
আবাসিক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ায় প্রতিটি পরিবারের মাসিক ইউটিলিটি বিল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সীমিত আয়ের চাকরিজীবীদের আয়ের বড় অংশই চলে যাবে বিদ্যুৎ বিল এবং যাতায়াত খরচ মেটাতে।
গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো এবং পল্লি বিদ্যুতের ট্যারিফ বাড়ায় প্রান্তিক কৃষকদের ওপর সেচ ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের খরচ বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতির (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ভোরের কাগজকে বলেন, একেরপর এক গ্যাস, জ্বালানি তেল ও সর্বোপরি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তা সাধারণ কঠিন অবস্থার মুখে পড়বে। ব্যক্তিগত খরচ, ইউটিলিটি খরচ বাড়বে। শিল্প-কারখানা ও কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। পরিবহন খরচ বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। জনজীবনে পড়বে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব।
তিনি বলেন, করোনা মহামারিতে পড়া অর্থনৈতিক ধকল এখনো কাটেনি। মানুষের আয় বাড়েনি, খরচ বেড়েছে। এত দিন ধার-দেনা করে সংসার চালিয়েছে। কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতিও নেই। জীবন-জীবিকা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের কাছে দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহক পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়েছে। ক্ষোভের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করছেন এই ভোক্তাঅধিকারকর্মী।
মূল্যহার : সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, খুচরা বিদ্যুৎ মূল্যহার (ভারিত গড়) প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় করা হয়েছে।
অপরদিকে পাইকারি মূল্যহার (ভারিত গড়) প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ মূল্য বাড়ানো হয়েছে। সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ইউনিটপ্রতি ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা করা হয়েছে। এতে সঞ্চালন চার্জ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিবিপিএলসি)-এর সঞ্চালন ব্যয় বিবেচনায় বিদ্যুতের বিদ্যমান সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ (ভারিত গড়) প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ০.৩১৩৫ টাকা থেকে ০.০৭৫১ টাকা বাড়িয়ে ০.৩৮৮৬ টাকা করা হয়েছে। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহকদের (মাসিক ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী) জন্য ইউনিট প্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ৬৯ পয়সা বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছে।
শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫১ পয়সা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯ টাকা ১০ পয়সা। ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৮ টাকা ২ পয়সা থেকে ১ টাকা ৬০ পয়সা বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সা। ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ২ টাকা ৩৪ পয়সা বাড়িয়ে ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের ওপরে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৪ পয়সা বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা বাড়ানো হয়েছে।
কৃষি সেচে ইউনিট প্রতি ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছে। শিক্ষা, ধর্মীয়, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে।
রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের ক্ষেত্রে ৯ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা করা হয়েছে। ক্ষুদ্রশিল্পের ক্ষেত্রে ১১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করা হয়েছে। নির্মাণশিল্পে ১৫ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা ৯ পয়সা করা হয়েছে।
ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও ব্যাটারিচার্জিং স্টেশনে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ও অফিসে ১৩ টাকা ১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আবেদন, দাখিলকৃত দলিলাদি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত পর্যালোচনার পর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ অনুযায়ী পাইকারি, সঞ্চালন এবং খুচরা মূল্যহার পুননির্ধারণ করা হয়েছে।
সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিট প্রতি ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হওয়ায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করে। নানা ঘটনার পর এক পর্যায়ে ১৮ এপ্রিল চার ধরনের তেলের (অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন) দাম বাড়ায় সরকার। মে মাসে আর না বাড়ালেও এই জুনে এসে আবার ডিজেল বাদে বাকি তিন ধরনের তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে লিটারে ৫ টাকা। জ্বালানি তেলে বাড়ানোর পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং বিদ্যুৎ খাতে বিশাল ভর্তুকির চাপ কমাতেই এই সমন্বয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হবে। তবে সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব হবে অত্যন্ত নেতিবাচক।
গণশুনানিতে বিরোধিতা : গত ৩ থেকে ৬ মে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার এবং সঞ্চালন মাশুল বাড়ানোর আবেদন করে বিইআরসির কাছে। পরে ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে রাজনৈতিক নেতা, ভোক্তা অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি ছিল, খাতটির দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও ভুল পরিকল্পনার দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপানো উচিত নয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পিডিবি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছিল। এছাড়া পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসিও সঞ্চালন মূল্যহার বাড়ানোর আবেদন করে।
