×

সাময়িকী

বিপন্ন সময়ের অনন্য গল্পকার নরেন্দ্রনাথ মিত্র

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৯ পিএম

বিপন্ন সময়ের অনন্য গল্পকার নরেন্দ্রনাথ মিত্র

আজ মৃত্যুর চুয়াল্লিশ বছর পার হতে চলেছে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ছোটগল্পকার নরেন্দ্রনাথ মিত্রের। প্রায় নীরবে-নিভৃতে চলে গেল এতগুলো বছর। দিন সংখ্যা গণনা করলে তাঁর মহাপ্রয়াণ একেবারে কম দিন নয়। জগতের কৃতিমান মানুষেরা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় কিন্তু পেছনে পড়ে থাকে তাঁদের কৃতি। সেই কৃতির সরণিতে পা ফেলে পরবর্তী প্রজন্ম চলার এবং উপরে ওঠার দিশা খুঁজে পায়। ফলে আলোকিত পূর্বসূরিদের আলোচনা নতুন প্রজন্মের জন্য প্রাসঙ্গিকভাবেই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। জগতের সকল সফল মানুষ সে কারণেই আমাদের প্রাত্যহিক পথ চেনার বাতিঘর হয়ে ওঠেন। বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় নরেন্দ্রনাথ মিত্র তেমনি একজন সফল কথানির্মাতা যাঁর সঙ্গে বসবাস আমাদের প্রয়োজনেই একান্ত অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মানবিক অনুভূতিতে দ্যুতিমান এই লেখককে নিয়ে এপার কী ওপার বাংলায় তেমন কেন আয়োজন চোখে পড়ে না বললেই চলে। অবশ্য আয়োজনের ঘনঘটা কী আকার পেল আর না পেল সেটা বড় কথা নয়। বরং বিপুল পরিমাণ গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে তিনি কতখানি প্রাতিস্বিক তাই বিবেচনার বিষয়। নরেন্দ্রনাথ মিত্র ৪০-এর দশকের গল্পকার। তিনি ১৯১৬ সালে অবিভক্ত বাঙলার ফরিদপুরের ভাঙা থানায় জন্মগ্রহণ করেন। এই মহান মানুষটি যে সময় গল্পের জগতে প্রবেশ করেন তখন বাংলার আকাশ ছিল অসংখ্য ঘটনার বিষবাষ্পে উত্তপ্ত। ‘মোরা একবৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান/মুসলিম তার নয়নমণি হিন্দু তার প্রাণ’ অভিন্ন এই সম্পর্ক ভেঙে যায় ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের পর। এরপর বাংলার আকাশে ঘটে চলে একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দোলায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবিকতা। সাহিত্যধারায় বাংলা ছোটগল্পের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের প্রভাব উত্তরণে কল্লোলীয় লেখকরা তখন মাতোয়ারা। এ দলে যুক্ত হন মার্কসবাদী ঘরানার লেখকরা। সকলের চেতনায় আলোড়ন তোলে ফ্রয়েডীয় ধারণা। এক কথায় বিশ্বসাহিত্যের বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের নিরীক্ষা। ঠিক সে সময়ে বাংলার মানুষের ভাগ্যে সব থেকে বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের কূটচালে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে চিরদিনের বিরোধ সৃষ্টি হয়। ১৯৩৯ সালের বিশ্বযুদ্ধ ভারতবর্ষে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ঔপনিবেশিক শাসকদের অবহেলা আর তৎকালীন বাঙলা সরকারের ব্যর্থতায় ১৯৪৩ সালে নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। খাদ্যের অভাবে মারা যায় প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ। ঠিক পরের বছর ১৯৪৪ সালে দেখা দেয় বস্ত্র সংকট। অন্ন ও বস্ত্রের অভাবে দিশাহারা হয়ে পড়ে মানুষ। ১৯৪৫-এর যুদ্ধ শেষ হলে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গতি বাড়ে। কিন্তু মানুষের জীবনে ১৯৪৬ সালে আবার নেমে আসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো আর একটি মারাত্মক বিপর্যয়। এ বিপর্যয়ের মধ্যেই ঘটে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ। যুদ্ধ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগের অভিশাপে মানুষের পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবনে দেখা দেয় গভীর যন্ত্রণা ও নৈরাজ্য। সোজাকথায় ‘ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে প্রচলিত বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ বিনষ্টির ক্ষেত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামক ঝড়ের পর যেটুকু অবশিষ্ট ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্লাবন তার সবটুকুকে শিকড়সমেত উপড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’ (সৈয়দ আজিজুল হক)। ছেচল্লিশ ও সাতচল্লিশ-উত্তর সময়ে এপার-ওপার বাংলার প্রায় এক কোটি পনেরো লাখ মানুষ জীবনের নিরাপত্তা আর অজানা ভয়ে পূর্ব-পশ্চিমে ছুটতে থাকে। ঘরহারা মানুষগুলো চোখের নিমিষে অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক জীবনে হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। দেশভাগের অভিঘাতে ছিন্নমূল মানুষে ভরে যায় কলকাতাসহ তার আশপাশের এলাকা। শূন্য হাতে অচেনা জায়গায় জীবনের মৌলিক সমস্যায় পড়ে অসহায় মানুষগুলো চারদিকে অন্ধকার দেখতে থাকে। একইসঙ্গে কলকাতায় বসবাসকারী মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনেও নেমে আসে অপ্রত্যাশিত দুর্দশা। বাঁচার তাগিদে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনে ঘটে অবনমন। গল্পকার নরেন্দ্রনাথ মিত্র ঠিক এই সময়ে বাংলা ছোটগল্প রচনায় হাত দেন। রবীন্দ্রনাথ আর তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর) সৃষ্টিসম্ভারে বাঙলা সাহিত্যের আকাশ তখন আলোকময়। সেই আলোকদীপ্র সময়ে নরেন্দ্রনাথ গল্পের জগতে নিজেকে প্রকাশ করেন। নরেন্দ্রনাথ মিত্র ব্যক্তি মানুষ হিসেবে ছিলেন মানবিক ও সংবেদনশীল। ফলে প্রত্যক্ষ বিশ্বরাজনীতি ও ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ সংকট ও তা থেকে সৃষ্ট ক্ষত তাঁর শিল্পী হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। চল্লিশ দশকের বিক্ষুব্ধ সময় ও তার করুণ পরিণতি তাঁর লেখায় জায়গা পেতে থাকে সামাজিক দায়বোধ থেকে। লেখনী শুরু করেছিলেন ১৯৩৬ সালে দেশ পত্রিকায় ‘মূক’ নামক কবিতা দিয়ে। একই বছরে ঐ পত্রিকাতে প্রথম গল্প ‘মৃত্যু ও জীবন’ লিখে পা রাখেন গল্পের আঙিনায়। তারপর থেকেই নিয়মিত লিখে চলেন গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস। তবে সাহিত্যের অন্য শাখা থেকে ছোটগল্প বিনির্মাণে সবচেয়ে বেশি সফলতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। নরেন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস মূল্যায়নে একশ্রেণির সাহিত্যিক ও গবেষক বলেছেন তিনি নাগরিক মনস্ক মধ্যবিত্ত জীবনের পালাকার। আবার আরেক শ্রেণির সাহিত্য সমালোচক তাঁকে অভিহিত করেছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের চিত্রকর হিসেবে। কেউ কেউ আবার তাঁর গল্পে সমসাময়িক ঘটনার প্রত্যক্ষ পরিচয় নেই বলেও অভিমত রেখেছেন। অর্থাৎ রাজনীতির প্রত্যক্ষ উত্তাপ নিয়ে কম গল্প রচনা করেছেন নরেন্দ্রনাথ। কিন্তু সত্যি কথা হলো তাঁর গল্পে সে সময়ের ঘটনা নয় বরং ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জনজীবনের যে অবর্ণনীয় কষ্ট ও যাতনা তা নিখুঁতভাবে শিল্পিত সত্যের অঙ্গীকারে পরিস্ফুটিত করেছেন। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্পের শরীর জুড়ে আছে দেশভাগোত্তর সময়ের বিপন্ন ও অসহায় মানুষের মর্মন্তুদ চাহনি। তাঁর গল্পের বিষয় সম্পর্কে বলতে গিয়ে সমালোচক বলেন, ‘দেশের দুর্দশা মন্বন্তর এবং মানুষের মধ্যে যে বেকারত্ব, হতাশা বোধ এসেছিল সেই সব নিয়েই তিনি গল্প-উপন্যাস রচনা করেছেন। তাই তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যে যুদ্ধ বা মন্বন্তরের তুলনায় যুদ্ধ বা মন্বন্তরের কবলে পড়া মানুষের দুর্দশার কথা বেশি পাওয়া যায়।’ (সঞ্চয় প্রামাণিক)। ১৯৪৭-এর বেদনাময় ঘটনা ঘরহারা মানুষের কপালকে ঢেকে দেয় অন্ধকারে। উন্মূল এই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অসহায় বাঙালি আশ্রয় নেয় ফুটপাত, রেলস্টেশন ও বস্তিতে। পূর্ব জীবনের প্রবহমান অর্থনৈতিক বিন্যাস নষ্ট হওয়ার কারণে তারা প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়ে। নতুন জায়গায় ছিন্নমূল মানুষ দেখতে পায় শুধু নিরাশা, দুঃখ আর ব্যথা-বেদনা। এই বিপন্ন বাঙালির জীবন প্রতিবেশ, তাদের বিক্ষিপ্ত সামাজিক বিন্যাস, বেঁচে থাকার ব্যাকুল চেষ্টা, ঘটনার চাপে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা এবং নর-নারীর সম্পর্কের নানান দিককে গল্পে সযত্নে তুলে ধরেছেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র। বিক্ষিপ্ত সময়ের ছিন্নমূল মানুষের ভেতরের এই বেদনাকে শিল্পরূপ দিতে গিয়ে তিনি রাজনীতি ও দাঙ্গার মতো ভয়ানক ক্ষতকে নিয়ে আক্ষরিক অর্থে খুব বেশি গল্পে রচনা করেননি। নিজের গল্প সম্পর্কে তাই এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ‘ঘৃণা বিদ্বেষ ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ বৈরিতা আমাকে লেখায় প্রবৃত্ত করেনি। বরং বিপরীত দিকের প্রীতি প্রেম সৌহার্দ্য, স্নেহ শ্রদ্ধা ভালোবাসা, পারিবারিক গণ্ডির ভেতরে ও বাইরে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক বারবার আমার গল্পের বিষয় হয়ে উঠেছে।’ আমরা তাঁর গল্পে মধ্যে তাই চেনা মানুষের সমস্যা, তা থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার সংগ্রাম এবং তাদের সদর্থক পরিণতির প্রচেষ্টাকে লক্ষ করি। ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিমানুষের মর্মবেদনার সুরটিকে তিনি অনুরণিত করে’ তুলেছেন গল্পসমূহের ভেতর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে বিশ্ব বাজারে যে অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসে তার প্রভাব পড়ে বাঙালি জীবনে। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা আর দেশভাগের ফলে দেশে বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বিরূপ এই পরিস্থিতিতে অর্থের কারণে জীবনের সকল ক্ষেত্র ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। একজন বড় মাপের শিল্পী হিসেবে নরেন্দ্রনাথ মিত্র বিষয়টিকে গভীরভাবে অনুভব করেন এবং অসামান্য দক্ষতায় তাঁর গল্পে টাকা ও মনস্তত্ত্বের আশ্চর্য রসায়ন ঘটান। বিত্তহীন মানুষের অর্থ সংকটের ওপর তিনি লিখেছেন, ‘চোর’, ‘সিগারেট’, ‘একটি দশ টাকার নোট’, ‘চড়াই-উৎরাই’ ও ‘ছবির’ মতো অসাধারণ গল্প। গল্পের ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রেও নরেন্দ্রনাথ মিত্র বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ (২৯ ভাদ্র, ১৪২৬) প্রতিভাবান এ গল্পকারের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। মহাপ্রয়াণের এই দিনে লেখকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। নরেন্দ্রনাথ মিত্র বাঙালি পাঠকের মাঝে বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আজ, এখন, তখন এবং সর্বক্ষণ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মন্ত্রীদের ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফর বাতিল

শ্রমিক অসন্তোষ মন্ত্রীদের ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফর বাতিল

 চার দিন গ্যাসের স্বল্পচাপে ভুগবে সারা দেশ

চার দিন গ্যাসের স্বল্পচাপে ভুগবে সারা দেশ

তাহসিফের সঙ্গে থাকা তরুণী দিশা ৪ দিনের রিমান্ডে

তাহসিফের সঙ্গে থাকা তরুণী দিশা ৪ দিনের রিমান্ডে

কত টাকা বেতন পান গার্মেন্টসকর্মীরা

কত টাকা বেতন পান গার্মেন্টসকর্মীরা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App