বিরোধীদলীয় নেতা
চব্বিশের চেতনাকে ভুলিয়ে দেওয়ার আত্মঘাতী অপচেষ্টায় লিপ্ত সরকার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ১০:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ২০২৪-এর আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল বর্তমান সরকার চব্বিশের চেতনাকে ভুলিয়ে দেওয়ার এক আত্মঘাতী ও অপরিণামদর্শী অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়ে পরবর্তীতে সেই গণভোটের রায়কে পদদলিত করে জাতির সঙ্গে এক প্রকার প্রতারণা শুরু করেছেন। এই সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য বুমেরাং হবে।
বুধবার (২৪ জুন) সকালে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, বর্তমানে সরকারি দলের লোকদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাণিজ্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঘুষ-দুর্নীতি চলছে অবাধে। সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই মাত্র সাড়ে তিন মাসে তাদের শতাধিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। তাছাড়া বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলায় জাতীয় নির্বাচনের আগে শেরপুরে জামায়াতের এক নেতা, নির্বাচনের পরে চুয়াডাঙ্গায় জামায়াতের দুই নেতাকর্মী এবং অতি সম্প্রতি গাইবান্ধায় ছাত্রশিবিরের এক নেতা নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দেশে হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, যার ফলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী জন্মলগ্ন থেকে ৩-দফা দাওয়াত ও ৪-দফা কর্মসূচি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এ দীর্ঘ যাত্রাপথে জামায়াতে ইসলামীকে নানা চড়াই-উৎড়াই পার হতে হয়েছে এবং এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হচ্ছে। জামায়াতের এই পথচলায় আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দাকে হাজারো জেল-জুলুম, হামলা-মামলাসহ অবর্ণনীয় হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অনেককে শাহাদাতের পিয়ালা পান করতে হয়েছে। শাহাদাতের সিঁড়ি বেয়ে রক্তাক্ত এই পথেই আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামী তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী নীতির আলোকে নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পন্থায় রাজনীতি করে আসছে। দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ অবদান রয়েছে। জাতীয় সংসদের অংশীদারিত্বমূলক সকল নির্বাচনেই জামায়াতের প্রতিনিধি ছিল। জামায়াতের দুইজন মন্ত্রী তিনটি মন্ত্রণালয়ে দেশ ও জাতি গঠনে তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে দেশবাসীর প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর বর্তমান জাতীয় সংসদেও জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বৈষম্য, দারিদ্র্যমুক্ত এবং মর্যাদাপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
ব্যাংকিং খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের কিছু ভুল ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলে ধ্বংসপ্রায় ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’ যখন মাত্র ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সরকার ব্যাংকটিকে পুনরায় ফ্যাসিবাদের দোসরদের হাতে তুলে দেওয়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা মনে করি, সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে সমূলে ধ্বংস করে দেবে। দেশবাসী আশা করে, সরকার এই ক্ষেত্রে দ্রুত শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবে।
তিনি আরো বলেন, সরকার দেশের শিক্ষা, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে নগ্ন দলীয়করণ করছে। এমনকি নবগঠিত সংসদেও চরম বৈষম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এভাবে সরকার ক্রমান্বয়ে একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা জাতির জন্য চরম হতাশাজনক।
সভার সমাপনী ভাষণে জামায়াত আমির বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ জাতির সামনে দৃশ্যমান। পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি ও তাদের দোসররা দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে আমাদের উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করবে। এই ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত ধৈর্য ও সতর্কতার সাথে পথ চলতে হবে এবং কারো পাতা ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।
তরুণ সমাজ ও আলেমদের গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশের বিরুদ্ধে নানামুখী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চলা সত্ত্বেও আমরা আশাবাদী। কারণ আমাদের রয়েছে একটি সচেতন তরুণ ও যুবসমাজ। তাদেরকে পিতা ও অভিভাবকের পরম মমতায় আগলে রাখতে হবে এবং ভালোবাসার সাথে বুকে টেনে নিতে হবে। তাদেরকে দেশপ্রেমিক ও আদর্শ ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে; এরাই হবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও অতন্দ্র প্রহরী। একই সাথে সমাজের প্রতিটি স্তরে আলেম সমাজের বিরাট অবদান রয়েছে। দেশবাসী আলেমদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। বরেণ্য আলেম সমাজের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাদের দেশ গঠনে আরও ইতিবাচক ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা যেন জাতির সব বাধা ও পিচ্ছিল পরিস্থিতি দূর করে দেন। চব্বিশের শহীদরা যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশের জন্য তাদের অমূল্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং হাজারো পঙ্গুত্ববরণকারী ভাই-বোনেরা যে কঠিন ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে একটি বৈষম্যমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গঠনে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
জামায়াত আমিরের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঞ্চালনায় সভার শুরুতে দারসুল কোরআন পেশ করেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএ মা’ছুম। পরে সেক্রেটারি জেনারেল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সভায় উপস্থাপন করেন। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের (পুরুষ ও মহিলা) সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পুশইন ইস্যুসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া আগামী ২৬ জুন অনুষ্ঠিতব্য দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার আসন্ন অধিবেশন এবং অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক বিবিধ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়।
