লালমনিরহাট
শিক্ষকের মুখোশে লম্পট! স্কুলছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় ফুঁসছে গোটা এলাকা
রবিউল ইসলাম বাবুল, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষার আলো ছড়ানোর পবিত্র আঙিনাই এবার কলঙ্কিত হলো শিক্ষকের চরম নৈতিক অবক্ষয়ে। লালমনিরহাটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি আদিতমারী জি.এস. উচ্চবিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে একাধিকবার ধর্ষণ এবং অপর এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
জঘন্য এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্ত লম্পট শিক্ষকদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা ও স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার (২১ জুন) দুপুরে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালে জাতীয়করণ হওয়া এই বিদ্যালয়টির পাশেই আইসিটি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক জাহিদ ইমাম শান্তর বাসা। সেখানে তিনি নিয়মিত ব্যাচ করে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়াতেন। প্রাইভেটের নামে অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা এখান থেকেই। ঐ শিক্ষক প্রলোভন ও ব্ল্যাকমেইল করে ছাত্রীদের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতেন, এক পর্যায়ে ছাত্রীদের কুপ্রস্তাবের মাধ্যমে শ্লীলতাহানি করতেন, না মানলে ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ করতেন।
একই ঘটনায় ভুক্তভোগী নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর অভিযোগ, বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান না থাকার সুযোগে এবং পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে শিক্ষক জাহিদ ইমাম শান্ত তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন।
অন্যদিকে, সমান্তরালভাবে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছেন বিদ্যালয়টির ভোকেশনাল শাখার কারিগরি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র রায়। স্কুলের কাছেই ঘর ভাড়া নিয়ে প্রাইভেট পড়ানোর নামে তিনি সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন এবং গোপনে আরও অনেকের সাথে এমন আচরণ করেন বলে লোকমুখে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, শ্লীলতাহানির শিকার সপ্তম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী বাড়িতে বিষয়টি জানালে গত ১৪ জুন তার পরিবার বিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রথম লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। এর পরপরই সাহস পেয়ে ১৫ জুন অপর ভুক্তভোগী নবম শ্রেণির ছাত্রীটি আইসিটি শিক্ষক জাহিদ ইমাম শান্তর বিরুদ্ধে ধর্ষণের রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেয়।
শুরুতে বিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাটি সম্পূর্ণরূপে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, ফলে অপরাধী দুই শিক্ষক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং শিক্ষার্থীর পরিবারকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করার চেষ্টা করেছে। পরে ১৭ জুন বিষয়টি সম্পূর্ণ জানাজানি হলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়, যা রোববার বিশাল গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে আইসিটি শিক্ষক জাহিদ ইমাম শান্ত ফোন ধরেননি। ঘটনায় অভিযুক্ত নারায়ণ চন্দ্র রায় নামের আরেক লম্পট শিক্ষককে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে। তবে তাদের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় আগামী ২৫ জুন পর্যন্ত দুজনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সৃষ্ট ঘটনায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আরা সিদ্দিকা বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে অভিযুক্তদের ছুটিতে রাখা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে অভিভাবকদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে।
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব জানান, এই ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বা কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলেই দ্রুততম সময়ে এই জঘন্য অপরাধের তদন্ত সাপেক্ষে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও আদিতমারী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজিজা বেগম দৈনিক ভোরের কাগজ সাংবাদিককে বলেন, "বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষক তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। যেহেতু এটি সরকারি বিদ্যালয়, তাই চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। যেহেতু বিষয়টির সত্যতা পাওয়া গেছে এবং স্কুল কমিটি ও তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতেই বিধি মোতাবেক দুই শিক্ষকের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।" বলে জানান তিনি।
এদিকে মানববন্ধন থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি ঐ দুই শিক্ষকের এহেন জঘন্য কাজের সঠিক বিচার না হয়, তাদেরকে কোনোভাবে মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে কঠোর থেকে কঠোর আন্দোলনে যাবেন এ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ এলাকাবাসী।
