দিভাস কৃষ্ণ বিশ্বাসের ছোটগল্প
ঝরাফুলের পিতা
দিভাস কৃষ্ণ বিশ্বাস
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৬ পিএম
দিভাস কৃষ্ণ বিশ্বাস
ছোট্ট মেয়েটার লাশ আঁড়-কোলে নিয়ে, নগরীর ব্যস্তময় রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটছে লাশটির পিতা।
মরণের আগ পর্যন্ত বাচ্চা মেয়েটার নাম ছিলো স্বপ্না।
সদ্য বাবা হওয়ার আমেজটা তখনও তো বেঁচে ছিলো, তবে এই বন্ধ্যা সমাজে বেঁচে থাকতে পারলো না বাবার আদুরে ফুটফুটে কন্যাটি।
স্বপ্নার মারা যাওয়াতে 'বাবা' উপাধিটা ছিটকে পড়লো মুহুর্তেই।
যেমন সম্মুখযুদ্ধে শত্রুর অবস্থান দেখতে মাথা উঁচু করা জগৎজ্যোতির চোখে বুলেট ঢুকে বের হয়ে যায়, ছিটকে পড়ে সে মাটিতে—
ঠিক তেমন, একদম তেমন।
একমাত্র মেয়ের নিথর, অস্বাভাবিক শান্ত মুখ দেখতে দেখতে হেঁটে চলে দুর্ভাগা দেশের অভাগা পিতা।
সোজা হেঁটে চলে, আর কোথাও তাকায় না, তাকানোর আর কিছু নেই।
এই শেষ দেখা, কিছুক্ষণ বাদে আর দেখতে পারবে না কলিজার টুকরা মেয়েকে।
বাপের দিকে তাকিয়ে আর হাসবে না বাচ্চাটি, ছোট্ট পাঁচটা আঙুল দিয়ে বাবার তর্জনী আর আঁকড়ে ধরবে না।
মৃত্যুর পর সবচেয়ে আপনজন মুহুর্তেই সবচেয়ে পর হয়ে যায়।
মেয়েকে নিয়ে যে মানুষটা সুদূর স্বপ্ন বুনেছিলো, তার চোখে এখন এক বিন্দু ভাবও নেই।
না কান্না, না চিৎকার, না ক্ষোভ—
শুধু শূন্যতা।
হাঁটতে হাঁটতে ফ্লাই ওভারে উঠে পড়ে মৃত কন্যা আর পিতা।
পায়ের গতি খানিক ধীর হয়ে এসেছে, পৃথিবীর টানে, নাকি ভেতরের ভাঙনে; বোঝা যায় না।
ফ্লাইওভার পার হলে কারাগার।
কোলে মৃত সন্তান নিয়ে পিতার চলার গতি এখন আর তার নিজের নয়, সে ভেসে যাচ্ছে।
সম্পূর্ণ বহমান, ক্লান্তিহীন। সন্তান হারা পিতার শক্তির উৎস খুঁজতে হয় না। মাঝ দরিয়ায় তুফান-গর্ভে যে নৌকা ডুবতে চায় তার বৈঠা রাখা লাগে না।
ফ্লাইওভার দিয়ে ছুটে চলা বাস, গাড়ি, মোটরসাইকেল, অটোরিকশার মানুষগুলো একবার ঘাড় বেঁকিয়ে তাকায়—
তারপর চলে যায়।
নির্লজ্জের মতো।
ওদেরই বা দোষ কি?
বেচারা–পশুই তো।
ওরা কি সত্যিই জীবিত?
ওদের ভেতরে আদৌ কি আর প্রাণ আছে?
ফ্লাইওভারের রেলিং ঘেঁষে গড়ায় গড়ায় চলে মহামারি।
মহামারি জিজ্ঞেস করে—
''দোষটা কি আমার?''
মরা বাচ্চার বাবাটা একটুও থামে না, তাকায়ও না।
হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দেয়—
“না গো, তোমার দোষ হইবো ক্যান?
দোষ তো আমারই।
মেয়েটারে আমি কুক্ষণে জন্ম দিছিলাম।
দেখলাম দেশে অসুর, পিশাচ আইসা পড়ছে—
কামড়ায়, ছিঁড়ে দেশটারে খাইতেছে…
আর সেই সময়েই আমি বাচ্চাডারে জন্ম দিলাম।
বাচ্চাডার খুনি আমি নিজেই।
আর কেউ না।”
মহামারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
''আমারও ভালো লাগতেছে না এই কাজটা।
কতবছর পর ভীনদেশী অসুর গুলা আমারে জোর কইরা মর্তে নামাইলো। মহা যজ্ঞ করলো আমারে তোমাগের মধ্যে ছড়ায় দিতে।
সে কি এলাহি কান্ড! চন্দন কাঠের সমিধ, কেজি কেজি খাঁটি ঘি, সোনার বর্দী, বাসমতীর পুরোডাশ আরও কত কী দিয়ে সাজাইলো সে মহাযজ্ঞ।
লক্ষ্মণ বলয় ভাইঙা গেলো আর আমি গন্ধের মত ছড়ায় পড়লাম।
এত বাচ্চা মারতেছি…
এত যন্ত্রণা দিতেছি…
এই রাহাজানি আর নিতে পারতেছি না।
আর যাইতেও পারতেছি না।
আমার নিজের উপর আমার কোনো কন্ট্রোল নাই।
বেয়াল্লিশ হাজার কোটি বার মন্ত্র জপ কইরা আমারে নামাইছে ওরা, ঐ বুড়ো পুরুতটা…
আমার তেজ কমানো কঠিন।
এই কচি কচি জানের ছদগা না নিলে আমার মুক্তি নাই।
আমারে ক্ষমা কইরা দিও, তোমার বাচ্চাডারে…”
কথা শেষ না করেই মহামারি গড়িয়ে চলে যায়—
অন্য কারও প্রাণের খোঁজে।
কারাগারের সামনে পৌঁছাতেই ছাই রঙা পোশাক পরা দুইজন প্রহরী পথ আটকে দেয়।
রাত নেমে এসেছে বেশ,
ধুলোভরা আকাশে তারার গায় ধুলো জমে আছে।
কারাগারে কারেন্ট নেই, পূর্ণিমার আলোয় স্বপ্নার মুখটা স্পষ্ট ভেসে ওঠে— অস্বাভাবিক শান্ত।
“কি চান?”—একজন জিজ্ঞেস করে।
''আমার বউ কারাগারে বন্দী।
আমারে একটু তার কাছে নিয়ে যান।
আমাদের মেয়েটা মারা গেছে।
শেষ বারের মত দেখাইতে আসছি।
মরার সময় মুখে জল দিতে পারি নাই।''
সহজ করে বলে গেলো কঠিন কথা গুলো,
দরিদ্র প্রেতাত্মার মত।
একজন বয়স্ক নারী-কারারক্ষী এগিয়ে আসে।
কিছু জিজ্ঞেস করে না।
শুধু ভেতরে নিয়ে যায়।
স্বপ্নার মা আসে।
মেয়ের নিথর মরা মুখ দেখে থমকে যায়।
কিছু বলে না।
মৃদু করে ঠোঁট কাঁপে,
গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখের জল।
সে ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে কোলে নেয়।
বসে পড়ে।
তারপর—
মৃত মেয়ের মুখে স্তন গুঁজে দেয়।
দুধ গড়িয়ে পড়ে স্বপ্নার গাল বেয়ে।
সমস্ত পৃথিবী একেবারে থমকে যায়।
কেউ কিছু বলে না।
মাতৃত্বের কোলে আবারও হার মানে নির্মম মহাকাল।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক নারী-কারারক্ষী বাইরে তাকিয়ে থাকে—
মহাকাল সাক্ষী রেখে কাদেরকে যেন মন থেকে অভিশাপ দেয়, মনে মনে।
উনি একাই কাঁদে।
নিঃশব্দে।
মনে হয়, উনি এই পৃথিবীর কেউ নন,
ওপার থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছেন।
যেখান থেকে আর কিছুই করার নেই।
মেঘে ঢেকে যায় পূর্ণিমার চাঁদ।
অন্ধকারে ঢেকে যায় চোখের জল।
সহজে আলো আসবে না এখানে।
ঝড় আসবে—
তুমুল ঝড়।
