×

মুক্তচিন্তা

মব কালচার বন্ধে হুঁশিয়ারি নয়, চাই দৃষ্টান্তমূলক আইনী পদক্ষেপ

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ১০:১৮ পিএম

মব কালচার বন্ধে হুঁশিয়ারি নয়, চাই দৃষ্টান্তমূলক আইনী পদক্ষেপ

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে ‘মব কালচার’ বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশে আর কোনো ধরনের ‘মব কালচার’ হতে দেওয়া হবে না। দাবি-দাওয়া আদায়ে রাস্তা অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি সহ্য করা হবে না। গণতান্ত্রিক কর্মসূচি চলবে, কিন্তু সহিংসতা নয়। এর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গত ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, দেশে আর কোনোভাবেই ‘মব কালচার’ চলতে দেওয়া হবে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রথমবারের ঘোষণার প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে কতটা দৃশ্যমান?

বাস্তবতা বলছে, প্রথমবার ঘোষণার দিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক কার্যালয়, স্মৃতিস্তম্ভ এমনকি জনসমাবেশও রেহাই পায়নি। এগুলো নিছক দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। যখন কোনো গোষ্ঠী নিজেরাই 'বিচারক, জুরি ও কার্যকরকারী' হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

মব সন্ত্রাসের প্রকৃতি সরল হলেও ভয়ংকর। কোনো অভিযোগ বা গুজব যাচাই না করেই একদল মানুষ মুহূর্তে সহিংস হয়ে ওঠে। এতে আদালত, তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক বিচার- এই মৌলিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। অপরাধী হলেও কাউকে পিটিয়ে হত্যা বা লাঞ্ছিত করার অধিকার কারও নেই। এটি সংবিধান, ফৌজদারি আইন ও মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত একটি মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অন্তত ২৯২টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী দেড় বছরে প্রায় ২৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এসব সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়,এগুলো আইনের শাসন ভেঙে পড়ার নির্মম দলিল।

উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো,অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও কার্যকর হস্তক্ষেপের অভাব। কোথাও মবের চাপে পুলিশ পিছু হটেছে, কোথাও নিষ্ক্রিয় থেকেছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। এতে কেবল সক্ষমতা নয়, মনোবল ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ঘোষণার কঠোরতা মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপে রূপ না নিলে অপরাধীরা বরং উৎসাহিত হয়।

মব সন্ত্রাস শুধু প্রাণহানি ঘটায় না, এটি সমাজে ভয়, অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্যের সংস্কৃতি তৈরি করে। এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। নাগরিক আস্থার এই অবক্ষয় রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গভীর সংকট ডেকে আনতে পারে।

এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখছে। যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে জনতাকে উসকে দিচ্ছে। কখনো 'উচ্ছৃঙ্খল জনতা', কখনো 'তৌহিদি জনতা'-বিভিন্ন নামে সংগঠিত হয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, মাজার, প্রকাশনা সংস্থা ও গণমাধ্যমে হামলার ঘটনা ঘটছে। বহুত্ববাদী বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।

গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনও এ সহিংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী বা ছায়ানট, এগুলো কোনো দলীয় কার্যালয় নয়, বরং রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে হামলা মানে কেবল সম্পত্তির ক্ষতি নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের ওপর আঘাত।

বাস্তবতা হলো- যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। মব সন্ত্রাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি অপরাধকে ব্যক্তির হাত থেকে ভিড়ের হাতে তুলে দেয়। এতে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষয় হয় এবং প্রতিশোধপরায়ণতার সংস্কৃতি জন্ম নেয়।

এই প্রেক্ষাপটে কেবল মৌখিক হুঁশিয়ারি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন-

১.দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার

২.নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ

৩.আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা

৪.রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি

সরকার চাইলে অতীতের ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে। এতে সত্য উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ ও নীতিগত সংস্কারের পথ সুগম হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রশ্ন।

গণতন্ত্রে মতভিন্নতা শক্তি, সহিংসতা তার মৃত্যু ঘণ্টা। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। গুজব ছড়ানো থেকে শুরু করে সংগঠিত হামলা- সব ক্ষেত্রেই দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় 'মব কালচার' ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিপজ্জনক উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।

মব সন্ত্রাস কোনো পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি লাভ বয়ে আনে না। বরং রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, সমাজকে বিভক্ত করে এবং গণতন্ত্রকে ক্ষয় করে। এখনই লাগাম টানা না গেলে এই আগুন একদিন সবার ঘরেই পৌঁছাবে।

সরকারের জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুহূর্ত- আইনের শাসন কি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

ইতিহাস নীরব দর্শক নয়। দায়িত্বহীনতা ও নৈরাজ্যের মূল্য একসময় রাষ্ট্রকেই দিতে হয়। তাই সময় এখনই দৃঢ়তা, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। এটাই সময়ের দাবি, এটাই জাতির প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

থানা থেকে আসামির পলায়ন

থানা থেকে আসামির পলায়ন

বিয়ে করেছেন সিমরিন লুবাবা

বিয়ে করেছেন সিমরিন লুবাবা

সিগারেট-তামাকের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত

সিগারেট-তামাকের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত

সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগীর পিস্তল উদ্ধার

সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগীর পিস্তল উদ্ধার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App