×

মুক্তচিন্তা

মুজিবনগর সরকার: অন্ধকার ভেদ করা এক জাতির প্রথম আলোর দিশা

Icon

তাহসিনুল বাকী ফাহিম

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম

মুজিবনগর সরকার: অন্ধকার ভেদ করা এক জাতির প্রথম আলোর দিশা

ছবি: মুজিবনগর সরকার: অন্ধকার ভেদ করা এক জাতির প্রথম আলোর দিশা

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল—বাংলার ইতিহাসে এক অনির্বচনীয় দিন। এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি এক জাতির আত্মপ্রকাশের ঘোষণা, এক দমবন্ধ অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে যাত্রার সূচনা। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার সেই নিভৃত আম্রকানন, আজকের মুজিবনগর, সেদিন হয়ে উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী—স্বপ্ন, সাহস আর সংগ্রামের এক অনন্য মিলনস্থল।

২৫ মার্চের সেই কালরাত্রি বাঙালির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ আর দমন-পীড়নে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল পুরো জাতি। সেই অন্ধকারে যখন ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখনই ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার—মুজিবনগর সরকার। এটি ছিল কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি ছিল একটি জাতির আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ, একটি সুসংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর।

এই সরকারের কাঠামোই ছিল তার শক্তি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর নামেই রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট বার্তা দেয়—এই যুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ নয়, এটি একটি জনগণের বৈধ অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।

উপ-রাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন এবং সরকারের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ হয়ে ওঠেন এই সরকারের প্রাণশক্তি—যার বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও অক্লান্ত পরিশ্রম পুরো মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত রূপ দেয়।

মন্ত্রীপরিষদেও ছিল শক্তিশালী নেতৃত্ব। অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আর স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল রাখার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

অন্যদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এম. এ. জি. ওসমানী। তাঁর অধীনে সমগ্র দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে গড়ে তোলা হয় একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিরোধযুদ্ধ তাঁর নেতৃত্বেই পরিণত হয় একটি সমন্বিত জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে।

মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল—আবেগকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তারা রূপ দেয় একটি কার্যকর রাষ্ট্রযন্ত্রে। কূটনৈতিকভাবে বিশ্বজনমত গঠন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, শরণার্থী সংকট মোকাবিলা—সবকিছুই ছিল এই সরকারের পরিকল্পিত পদক্ষেপের অংশ। ফলে মুক্তিযুদ্ধ আর শুধুই একটি আঞ্চলিক সংঘাত ছিল না; তা হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক ন্যায়সংগ্রাম।

তবে এই সরকারের প্রকৃত শক্তি ছিল ঐক্য। রাজনৈতিক মতভেদ, ব্যক্তিগত বিভাজন—সবকিছুকে ছাপিয়ে সেদিন বাঙালি এক হয়েছিল একটি পতাকার নিচে। সেই ঐক্যই ছিল বিজয়ের মূল চালিকা শক্তি। মুজিবনগর সরকার তাই কোনো নির্দিষ্ট দলের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল আপামর বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

আজ, স্বাধীনতার বহু বছর পর দাঁড়িয়ে আমরা যখন উন্নয়ন ও অগ্রগতির গল্প বলি, তখন আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখতে হয়—আমরা কি সেই চেতনার প্রতি সত্য থাকতে পেরেছি? যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে মুজিবনগর সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তা কি আজ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে?

মুজিবনগর আমাদের শেখায়—একটি জাতিকে পরাজিত করা যায় না যদি তার নেতৃত্ব দৃঢ় হয়, যদি তার মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; এটি পথনির্দেশনা দেয়, শক্তি জোগায়, দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।

১৭ এপ্রিল তাই কেবল অতীতের একটি দিন নয়; এটি আমাদের বর্তমানের প্রেরণা এবং ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। সেই আম্রকাননের শপথ আজও আমাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর, সত্যের পক্ষে থাকার, এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার হিসেবে।

এই চেতনাকে যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে মুজিবনগর কেবল ইতিহাসে নয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে বেঁচে থাকবে। জয় বাংলা। 

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাশেদ প্রধানের পিএসের মুক্তির দাবি জামায়াতের

রাশেদ প্রধানের পিএসের মুক্তির দাবি জামায়াতের

 লেবাননে হামলা, বিশ্ব নিরাপত্তায় ‘সরাসরি হুমকি’

লেবাননে হামলা, বিশ্ব নিরাপত্তায় ‘সরাসরি হুমকি’

প্রবাসে আটকে থাকা বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে

আরিফুল হক চৌধুরী প্রবাসে আটকে থাকা বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে

ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের প্রস্তুতি

ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের প্রস্তুতি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App