×

মুক্তচিন্তা

জ্বর কমলেই কি ডেঙ্গুর বিপদ কাটে? যে সময়ে থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি সতর্ক

Icon

মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

 জ্বর কমলেই কি ডেঙ্গুর বিপদ কাটে? যে সময়ে থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি সতর্ক

ছবি: এআই নির্মিত

ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের পরিচিত রোগ নয়। বছরের বিভিন্ন সময়েই মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে শহর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এডিস মশার বিস্তারের সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণও বাড়ছে। ডেঙ্গুর জন্য দায়ী ডেঙ্গু ভাইরাস ফ্লাভিভাইরাস গোত্রের একটি আরএনএ ভাইরাস। এর প্রধান চারটি সেরোটাইপ হলো ১. ডিইএনভি, ২. ডিইএনভি, ৩. ডিইএনভি ও ৪. ডিইএনভি।

একজন মানুষ কোনো একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণত ওই ধরনটির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেন, কিন্তু অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা তৈরি হয় না। ফলে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন সেরোটাইপে আবার আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডেঙ্গু মূলত এডিস গোত্রের স্ত্রী মশার কামড়ে ছড়ায়। এডিস ইজিপ্টাই এর প্রধান বাহক হলেও এডিস অ্যালবোপিক্টাসও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। কোনো এডিস মশা ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ালে ভাইরাস মশার শরীরে প্রবেশ করে, সেখানে সংখ্যা বাড়তে বাড়তে লালাগ্রন্থিতে পৌঁছায়। পরে সেই মশা অন্য একজনকে কামড়ালে লালার সঙ্গে ভাইরাস তার শরীরে প্রবেশ করে।

এডিস মশা শুধু রাতে নয়, দিনের বেলাতেও সক্রিয় থাকে এবং সকাল ও বিকেলের দিকে কামড়ানোর প্রবণতা বেশি। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। বাড়ির ফুলের টব, টবের নিচের পাত্র, বালতি, ড্রাম, পানির পাত্র, পরিত্যক্ত বোতল, প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থান কিংবা ছাদে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিও এ মশার প্রজননস্থল হতে পারে। ডেঙ্গু সাধারণত একজন মানুষের শরীর থেকে সরাসরি অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায় না। তবে রক্ত সঞ্চালন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, সংক্রমিত সূচ এবং গর্ভবতী মায়ের মাধ্যমে শিশুর মধ্যে সংক্রমণের মতো বিরল ঘটনাও ঘটতে পারে।

ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর কয়েক দিনের মধ্যে সাধারণত উপসর্গ দেখা দেয়। হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ত্বকে লালচে দাগ বা র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ মৃদু থাকে এবং কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু জ্বর বা উপসর্গের তীব্রতা দেখে রোগীর পরবর্তী অবস্থা সবসময় বোঝা যায় না। জ্বর শুরুর তৃতীয় থেকে অষ্টম দিন পর্যন্ত সময়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা কিছু রোগীর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

এ সময় রক্তনালির ভেতর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে জমা হতে পারে। একে প্লাজমা লিকেজ বলা হয়। এর ফলে রক্তের কার্যকর পরিমাণ কমে গিয়ে রক্তচাপ নেমে যেতে পারে এবং গুরুতর অবস্থায় ডেঙ্গু শক দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর কমে যাওয়া মানেই বিপদ কেটে যাওয়া নয়। তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি, কালো পায়খানা বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা ঘুমঘুম ভাব, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, হাত পা ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া এবং প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া গুরুতর অবস্থার সতর্কসংকেত হতে পারে।

চার থেকে ছয় ঘণ্টা প্রস্রাব না হওয়া বা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপের পার্থক্য অর্থাৎ পালস প্রেসার কমে যাওয়া, বিশেষ করে ২০ মিলিমিটার পারদচাপ বা তার নিচে নেমে আসা, শকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। গুরুতর ডেঙ্গুতে মারাত্মক রক্তক্ষরণ ছাড়াও যকৃতের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া, শ্বাসকষ্ট, মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় সমস্যা, হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা কিংবা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই এসব লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।

ডেঙ্গুতে রক্তের বিভিন্ন উপাদানেও পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক রোগীর শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লাটিলেট কমে যেতে পারে এবং প্লাজমা লিকেজ হলে হেমাটোক্রিট বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে রোগীর অবস্থা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। রোগীর রক্তচাপ, নাড়ির গতি, পালস প্রেসার, হেমাটোক্রিট, প্লাটিলেট, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তক্ষরণের লক্ষণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা একসঙ্গে বিবেচনা করেই চিকিৎসক রোগীর ঝুঁকি মূল্যায়ন করেন। প্লাটিলেট কমে গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই, আবার শুধু প্লাটিলেট বাড়ানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করাও ঠিক নয়। পাকা পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, লেবু, আমলকী, ডালিমসহ পুষ্টিকর খাবার স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এগুলো দ্রুত প্লাটিলেট বাড়ায় এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

একইভাবে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্লাটিলেট সংখ্যা দেখে প্লাটিলেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। সক্রিয় রক্তক্ষরণ, রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, পরীক্ষার ফল এবং চিকিৎসকের ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে রোগের কততম দিন চলছে, রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, গর্ভাবস্থা, অন্য কোনো রোগ আছে কি না এবং কী ধরনের উপসর্গ রয়েছে, এসব বিবেচনা করে চিকিৎসক পরীক্ষা নির্ধারণ করেন। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে NS1 অ্যান্টিজেন বা ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্তের পরীক্ষা করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি শনাক্তের জন্য IgM, IgG বা প্রয়োজনীয় অন্য পরীক্ষা করা হতে পারে। তবে NS1 নেগেটিভ হলেই ডেঙ্গু পুরোপুরি বাদ যায় না। রোগের সময়কাল ও উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। তাই শুধু কোনো একটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর না করে রোগীর শারীরিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হলো পানিশূন্যতা প্রতিরোধ, শরীরে তরল ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখা, জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীর অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। জ্বরের প্রথম দিন থেকেই রোগীকে পর্যাপ্ত তরল দিতে হবে। রোগী সচেতন থাকলে এবং চিকিৎসকের কোনো বাধা না থাকলে অল্প অল্প করে বারবার ওরস্যালাইন, বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি, স্যুপ, বাসায় তৈরি ফলের রস বা লেবুর শরবত দেওয়া যেতে পারে। তবে রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্য কোনো অসুস্থতা বিবেচনায় মোট কতটা তরল প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। গুরুতর অবস্থায় শিরায় তরল দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তরল শরীরে জমে গিয়ে শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই শিরায় তরল দেওয়ার পরিমাণও রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে নির্ধারণ করা জরুরি। জ্বর ও শরীরব্যথার জন্য সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়।

অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেনসহ অন্যান্য NSAID জাতীয় ব্যথানাশক এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড কিংবা অন্য কোনো ওষুধও শুরু করা উচিত নয়। ডেঙ্গু রোগীর রক্তচাপ, নাড়ির গতি, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। এ সময় ফার্মেসির দোকানদার, টেকনিশিয়ান বা প্রতিবেশীর পরামর্শে চিকিৎসা না করে সরাসরি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই নিরাপদ। একই সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশার কামড় থেকেও রক্ষা করতে হবে। তাকে মশারির মধ্যে রাখা, ঘরের দরজা জানালা দিয়ে মশা প্রবেশের সুযোগ কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা জরুরি। কারণ অসুস্থ ব্যক্তির রক্ত থেকে এডিস মশা ভাইরাস নিয়ে অন্য সুস্থ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে।

ডেঙ্গুকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, তবে এ রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই। জ্বর হলেই ডেঙ্গু হয়েছে এমন নয়, আবার জ্বর কমে গেলেই রোগী পুরোপুরি বিপদমুক্ত হয়েছেন, এটিও ধরে নেওয়া যাবে না। বিশেষ করে জ্বর কমার সময় এবং পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় রোগীর দিকে বেশি নজর দিতে হবে। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও ওষুধ গ্রহণ এবং বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিদিন বাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে। ফুলের টব, টবের নিচের পাত্র, বালতি, ড্রাম, পরিত্যক্ত বোতল, প্লাস্টিকের পাত্রসহ যেসব স্থানে পানি জমতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পাত্রে পানি থাকলে তা ঢেকে রাখতে হবে। শুধু নোংরা পানি নয়, পরিষ্কার পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।

তাই ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশের জায়গাতেও নিয়মিত নজর দেওয়া দরকার। ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্যকর্মী বা সরকারের দায়িত্ব নয়, প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের সচেতনতার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নিজের বাড়ির জমে থাকা পানি অপসারণের পাশাপাশি প্রতিবেশী ও এলাকার মানুষকে সচেতন করাও জরুরি। ভয় নয়, প্রয়োজন সঠিক তথ্য, সতর্কতা এবং সময়মতো চিকিৎসা। রোগীর বিপৎসংকেত দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুজনিত গুরুতর জটিলতা ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

লেখক: মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ও সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

স্কুলের বেতন দিতে না পারা সেই সালমানের সম্পদ এখন কত

স্কুলের বেতন দিতে না পারা সেই সালমানের সম্পদ এখন কত

কেন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেন কোয়েল মল্লিক

কেন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেন কোয়েল মল্লিক

ইয়েমেনে শতাধিক যুদ্ধবিমান নিয়ে সৌদি জোটের হামলা

ইয়েমেনে শতাধিক যুদ্ধবিমান নিয়ে সৌদি জোটের হামলা

নৌকার বৈঠায় এখনো জেগে ওঠে সিংগাইর

নৌকার বৈঠায় এখনো জেগে ওঠে সিংগাইর

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App