ভালো ক্যারিয়ারই কি ভালো বিয়ের নিশ্চয়তা?
নাজমুল হাসান
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
ছবি: এআই নির্মিত
বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের বয়স কতটা গুরুত্বপূর্ণ- এই প্রশ্নটি আমাদের সমাজে নতুন নয়। বিশেষ করে মেয়েদের ক্যারিয়ার, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিয়ের সময় নিয়ে পরিবারে প্রায়ই এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অনেক অভিভাবক মনে করেন, আগে মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে হবে; পরে বিয়ের বিষয়টি ভাবা যাবে। আবার অন্য একটি মত হলো, অতিরিক্ত দেরি করলে উপযুক্ত জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়- ভালো ক্যারিয়ার কি সত্যিই ভালো বিয়ের নিশ্চয়তা দেয়, নাকি বিয়ের সিদ্ধান্তে বয়স, ব্যক্তিগত পছন্দ, মানসিক প্রস্তুতি ও পারিবারিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ?
এই বিতর্কের একটি দিক উঠে এসেছে ম্যাচমেকিং ও কাউন্সেলিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পাত্র-পাত্রীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, অনেক পুরুষ জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বয়সকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী পাত্রদের মধ্যে পাত্রীর বয়স নিয়ে নির্দিষ্ট পছন্দ দেখা যায়। তবে এটি কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার সার্বজনীন ফল নয়; বরং তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণ।
ক্যারিয়ার বনাম বিয়ে- দ্বন্দ্বটা কোথায়?
একটি প্রচলিত সামাজিক ধারণা হলো- মেয়েকে যত বেশি শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করা যাবে, তার জন্য তত ভালো পাত্র পাওয়া যাবে। এই ধারণার পেছনে যুক্তিও আছে। শিক্ষা একজন মানুষের চিন্তাশক্তি, আত্মনির্ভরতা, সামাজিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশাগত পরিচয়ই যে চূড়ান্ত বিষয়- এমন নিশ্চয়তা নেই। একজন সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী পাত্রীর ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, মানসিকতা, পারিবারিক পরিবেশ, পারস্পরিক বোঝাপড়া কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দিতে পারেন।
অন্যদিকে, ক্যারিয়ার গড়ার নামে বিয়ের সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেওয়াও সব পরিবারের জন্য একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের অগ্রাধিকার বদলায়। একজনের কাছে ক্যারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্যজনের কাছে পরিবার গঠন, মানসিক সামঞ্জস্য কিংবা ব্যক্তিগত জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বয়স কি সত্যিই বিয়ের ক্ষেত্রে বড় বিষয়?
বয়স নিয়ে সামাজিক বাস্তবতা অবশ্যই রয়েছে। অনেক পরিবার পাত্র-পাত্রীর বয়সের ব্যবধানকে বিবেচনায় নেয়। কেউ নিজের চেয়ে কম বয়সী সঙ্গী চান, কেউ আবার কাছাকাছি বয়সের মানুষকে বেশি উপযুক্ত মনে করেন। আবার এমন দম্পতিও রয়েছেন, যাদের বয়সের পার্থক্য প্রচলিত সামাজিক ধারণার সঙ্গে মেলে না, কিন্তু সম্পর্কটি সফল হয়েছে।
তাই কোনো নির্দিষ্ট বয়সের পর একজন নারী ‘বিয়ের বাজারে পিছিয়ে পড়েন’—এমন বক্তব্যকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে দেখা কঠিন। কারণ বিয়ে কোনো একক মানদণ্ডে পরিচালিত বাজারব্যবস্থা নয়। মানুষের পছন্দ, পারিবারিক সংস্কৃতি, আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক অবস্থান এবং ব্যক্তিগত জীবনদর্শন- সবকিছু মিলেই সিদ্ধান্ত তৈরি হয়।
তবে এটিও বাস্তব যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু সম্ভাব্য পাত্র-পাত্রীর ব্যক্তিগত পছন্দের পরিধি পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে চাইলে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে আগেভাগে খোলামেলা আলোচনা থাকা জরুরি।
অভিভাবকদের ভূমিকা কতটা?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে। একজন মেয়েকে যদি বলা হয়, ‘আগে পড়াশোনা করো, ক্যারিয়ার গড়ো, পরে বিয়ে’, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মেয়েটির নিজের মতামতও থাকা প্রয়োজন।
শুধু অভিভাবকের প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্যারিয়ার কিংবা বিয়ের সময় নির্ধারণ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু সামাজিক চাপের কারণে দ্রুত বিয়ে দেওয়াও সমাধান নয়।
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার নিজের ইচ্ছা, মানসিক প্রস্তুতি, শিক্ষাজীবন, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা এবং জীবনসঙ্গী সম্পর্কে প্রত্যাশা জানা জরুরি। বিয়ে একজন মানুষের জীবনের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত; তাই সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মতামতকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
‘ভালো পাত্র’ পাওয়ার ধারণাটিও প্রশ্নের মুখে
আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো- কম বয়সে বিয়ে করলে তুলনামূলকভাবে বেশি যোগ্য পাত্র পাওয়ার সুযোগ থাকে। এই ধারণা কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। কিন্তু এটিকে পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত সামাজিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রয়োজন।
কারণ একজন ‘ভালো পাত্র’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিও ব্যক্তিভেদে আলাদা। কারও কাছে উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ আয়ের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ, কারও কাছে সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ। আবার কেউ মানসিক সামঞ্জস্য, পারিবারিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্মানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।অর্থাৎ ভালো জীবনসঙ্গীর সংজ্ঞা শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না।
বিয়ের সিদ্ধান্তে ভারসাম্য জরুরি
মেয়েদের ক্যারিয়ারকে বিয়ের বিপরীতে দাঁড় করানোও সমস্যার সমাধান নয়। একইভাবে বিয়ের জন্য ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়ার ধারণাও আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একজন নারী উচ্চশিক্ষা শেষ করে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন এবং একই সঙ্গে নিজের পছন্দ ও প্রস্তুতি অনুযায়ী বিয়ের সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। আবার কেউ অপেক্ষাকৃত কম বয়সে বিয়ে করে পরবর্তী সময়ে পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে পারেন। কোন পথটি উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির পরিস্থিতির ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সিদ্ধান্তটি যেন সচেতন হয় এবং সংশ্লিষ্ট নারী নিজেই সেই সিদ্ধান্তের অংশ হন।
সামাজিক ধারণা নয়, প্রয়োজন বাস্তব আলোচনা
মেয়েদের বয়স নিয়ে সমাজে যেমন নানা ধরনের চাপ রয়েছে, তেমনি ‘ক্যারিয়ার করলেই ভালো বিয়ে হবে’—এমন ধারণাও অতিরঞ্জিত হতে পারে। বিয়ের সফলতা নির্ধারণ করে শুধু বয়স, সৌন্দর্য কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ, মানসিক সামঞ্জস্য এবং জীবন সম্পর্কে অভিন্ন বা সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই অভিভাবকদের জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- ‘কত বছর বয়সের মধ্যে মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে’ নয়; বরং ‘মেয়ের নিজের ইচ্ছা কী, সে বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত কি না এবং তার জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী কে হতে পারেন’।
একই সঙ্গে মেয়েদেরও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা দরকার। ক্যারিয়ার, শিক্ষা ও বিয়েকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে জীবনের পৃথক কিন্তু আন্তঃসম্পর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখাই হতে পারে বেশি কার্যকর।
শেষ পর্যন্ত বিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বয়সের পুরস্কার নয়, আবার ক্যারিয়ারও বিয়ের বিকল্প নয়। দুটোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার দায়িত্ব পরিবার ও ব্যক্তির- উভয়েরই। আর সেই ভারসাম্যের কেন্দ্রে থাকা উচিত একজন মানুষের নিজের ইচ্ছা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
লেখক: মো.নাজমুল হাসান, সাংবাদিক
