ডিসেম্বরে নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে চান শেখ হাসিনা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি বছরের ডিসেম্বরে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টার একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এই প্রথম তার দেশে ফেরার একটি সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষণা করলেন। রয়টার্স বলছে, টেলিফোনে তার এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা টেলিফোনে শেখ হাসিনা এই সাক্ষাৎকার দেন বলেও রয়টার্স জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপরও বাংলাদেশে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে।
তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়া শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা এর আগেও সামনে এসেছে। সম্প্রতি ভারতীয় একটি গণমাধ্যম শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে এ বছরই তার বাংলাদেশে ফেরার খবর জানায়। আবার ২০২৫ সালে অক্টোবরেও রয়টার্সকে দেয়া অপর এক বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ দেশের ভবিষ্যৎ ভূমিকা পালনে ফিরে আসবে, সেটা সরকারে হোক আর বিরোধী দলে হোক।
নির্বাসনে যাওয়ার পর এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও, এবারই প্রথম কোনো সরাসরি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার পরামর্শ করেননি। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ নির্বাসিত অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা যে একযোগে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়েও তিনি প্রথমবার মুখ খুললেন।
দিল্লিতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে এবং তাদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি, আর একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।
শেখ হাসিনা টেলিফোনে রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরতে চান। তারা আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করতে চান। বাংলাদেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।
ডিসেম্বরে ঠিক কবে বাংলাদেশে ফিরবেন, কখন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, তা উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানান শেখ হাসিনা। ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি বলেও তিনি জানিয়েছেন।
গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার- এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়- এই মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, কারাগারে যাওয়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ এর আগেও তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চব্বিশে দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসার সময় তার প্রাণনাশের হুমকি ছিল।
সরকারে থাকার সময় আওয়ামী লীগের ভুল হয়ে থাকতে পারে- এ ধরনের মন্তব্য করলেও কোনো ধরনের দায় স্বীকার না করে শেখ হাসিনা বলেন, কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।
বাংলাদেশের সরকার তাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতে চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই ফিরে যাব।
আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসন নিয়ে অনলাইন বৈঠক করেছেন বলে রয়টার্সকে জানান। তিনি বলেন, তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে থাকতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সিদ্ধান্ত জনগণই নিক।
রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে তার বিরুদ্ধে চলা বিচারের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, আমার মনে হয়, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক- আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।
শেখ হাসিনার সঙ্গে একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় আছে। এছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় নানা অভিযোগ এবং দুর্নীতির অভিযোগেও বিপুল সংখ্যক মামলা আছে।
এদিকে, শেখ হাসিনার এই বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের একটি মামলায় বিচার শেষে ঢাকায় আদালতে ফাঁসির রায় হয়েছে। আরো অনেক হত্যা মামলায় আদালতে তার বিচার চলছে। হাসিনার অপরাধের ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে। শেখ হাসিনা বা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে ফিরবেন কী ফিরবেন না, বা তারা কী করবেন- সেটা তাদের বিষয়, তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।
রিজভী বলেন, জুলাই আন্দোলনে তিনি যে হত্যার মহাযজ্ঞ চালিয়েছেন, শিশু-কিশোরদেরও হত্যা করেছেন। সেই হত্যাযজ্ঞের বিচার নিশ্চিত হোক, সেটা জনগণ চায়। আদালতে বিচার চলছে। ফলে অপরাধের ব্যাপারে বিচার হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার ফিরে আসা বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, ফলে তার বাংলাদেশে আসায় বাধা আছে। তিনি ভারতে যাওয়ার সময় তার কাছে কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট ছিল এবং সেটি পরে বাতিল হওয়ায় তার কাছে কোনো ভ্যালিড পাসপোর্ট নেই। ফলে সরকারের কাছ থেকে ট্রাভেল পাস না পেলে তার স্বেচ্ছায় ফেরা কঠিন হতে পারে।
তবে শেখ হাসিনার দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে এর আগে সাংবাদিকদের বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে, তবে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার মুভমেন্টের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নাই; কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে তার কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। একজন ফিউজিটিভের পক্ষে কোনো আইনগত সুবিধা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাকে অবশ্যই আসতে হবে, এই ট্রাইব্যুনালেই সারেন্ডার করতে হবে। এই ট্রাইব্যুনালেই সারেন্ডার করেই তাকে জেলে যেতে হবে এবং সেখান থেকে তাকে আপিল ফাইল করতে হবে বা যেই প্রক্রিয়ায় তিনি যেতে চান। সেক্ষেত্রে আপিল শুনানি সাপেক্ষেই কেবল পরবর্তী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব তার আগে নয়।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিএনপি সরকারও সেটাই বহাল রেখেছে। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ গত এপ্রিলে অনুমোদন করা হয়েছে জাতীয় সংসদ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালে একটি মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে গত বছরের ১৭ই নভেম্বর। ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরো কয়েকটি মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় সারাদেশে ৬৬৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৪৫৩টি।
