স্বস্তির বর্ষণে অস্থির বাজার, সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কিছুদিন আগে হাঁসফাঁস করা গরমে অনেকটা স্বস্তির বাতাস এনে দিয়েছিল বৃষ্টি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে টানা বৃষ্টিতে সেই স্বস্তি পরিণত হয়েছে ভোগান্তিতে। শুধু তাই নয়, এই বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে রাজধানীর কাঁচা বাজারে। বৃষ্টিতে অস্থির হয়েছে নিত্যপণ্যের বাজার। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। কাঁচা মরিচের ঝাঁজ এক লাফে বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। বেড়েছে মুরগি ও ডিমের দামও। আর মাছের দাম বরাবরের মতোই উচ্চ দামে স্থিতিশীল।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। গোপীবাগ বাজারে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার করতে এসেছিলেন মাকসুদুল হক ভূঁইয়া। ছাতা মাথায় সবজির দরদাম করছিলেন। বিক্রেতার কাছে সবজির দাম শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন তিনি। বলেন, এই দেশে বৃষ্টিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। গরমেও বাড়ে। গ্রীষ্মেও বাড়ে, শীতেও বাড়ে। তাইলে বাড়ে না কোন সময়? বিক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, একটা অজুহাত পাইলেই হলো। যে কোনো উছিলায় তাদের দাম বাড়ানো চাই-ই চাই। গত সপ্তাহে সবজির দামটা কিছুটা কম ছিল। এই সপ্তাহে এক লাফে অনেক সবজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।
আরেক ক্রেতা ইন্দ্রনীল রায় বলেন, বৃষ্টির অজুহাতে সরবরাহ কমের কথা বলছে বিক্রেতারা। কিন্তু বাজারে কোনো সবজির ঘাটতি নেই। সব দোকানেই ভরপুর সবজি। তাইলে সরবরাহ কম কেন বলছে? কেন বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে আমাদের?
সবজি বিক্রেতা রাজন মিয়া বলেন, আমাদের বেশি দামে কিনে আনতে হচ্ছে। তাই দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। দেশজুড়ে টানা বৃষ্টির ফলে ফসলের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। সেই সঙ্গে যাতায়াত ব্যবস্থায়ও বিঘ্ন ঘটছে। ফলে ঢাকায় সবজি সরবরাহ কমেছে। ফলে বাজার কিছুটা অস্থির।
কাঁচা মরিচসহ অধিকাংশ সবজির দাম ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে : বাজার ঘুরে দেখা গেছে, যে করলা চিচিঙ্গা, বরবটি, ধুন্দুল ও কাঁকরোল গত সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে গতকাল সেই সবজিই ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ঢেঁড়স গত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল ৫০ থেকে ৬০ টাকায়, কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পটলও গত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এই সপ্তাহে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কচুরমুখী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুনও কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সজনে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, টমেটো প্রকারভেদে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, মূলা ৭০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৬০ থেকে ৮০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ টাকা কেজি, লাউ প্রতি পিস ৬০ থেকে ৮০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ফালি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই নিত্যপণ্য। এক হালি লেবু মান ভেদে ১৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি ধনে পাতা ২৫০ টাকা এবং হাইব্রিড ধনেপাতা ১৮০ টাকা কেজি, কাঁচা কলা হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়, চাল কুমড়া ৬০ টাকা পিস এবং ক্যাপসিকাম ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল শাকের আঁটি প্রতি ১৫ টাকা, লাউ শাক ৪০ টাকা, কলমি শাক দুই আঁটি ২০ টাকা, পুঁই শাক ৪০ টাকা এবং ডাঁটা শাক দুই আঁটি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
মুরগি ও ডিমের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা : গত সপ্তাহেই রাজধানীর কাঁচাবাজারে মুরগির দাম বেড়েছিল। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়। গতকাল বাজারভেদে ১৭০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সোনালি মুরগির দাম ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা, লেয়ার ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬২০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাংসের বাজারে গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২শ’ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে এক ডজন সাদা ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম ১০০ টাকা আর লাল ডিম ১২০ টাকা ডজন হলেও গতকাল সাদা ডিম ১১০ থেকে ১২০ টাকা আর লাল ডিমের ডজন বিক্রি হয়েছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়। হাঁসের ডিম এক ডজন ১৮০ টাকায়, দেশি মুরগির ডিমের হালি ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
মাছের বাজারে কোনো পরিবর্তন হয়নি : কোনো সপ্তাহেই বাজারে গিয়ে কম দামে মাছ মিলে না। অধিকাংশ মাছের দামই চড়া থাকে। গতকালও এই চিত্র দেখা গেছে মাছের বাজারে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বড় রুই মাছ ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, মাঝারি রুই ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, ছোট রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং কাতলা ৩৪০ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, পাবদা ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, টেংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, পাঙ্গাশ ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা, চাষের কৈ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সিলভার কার্প ১৮০ থেকে ২৪০ টাকা এবং চিংড়ি ৮০০ থেকে ১২শ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারে ইলিশ ৩০০ গ্রাম ওজনের এক কেজি মাছ ১১শ’ টাকা থেকে ১২শ’ এবং ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ইলিশের কেজি ১৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা। মলা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, কাচকি মাছ ৪০০ টাকায় এবং পাঁচ মিশালি মাছ ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাল বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামেই : মাসখানেক ধরেই চালের দাম বেড়েছে। সেই অবস্থা গতকালও অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ চালের দাম নতুন করে বাড়েনি। আগের দামেই কেজিতে ৩ টাকা বেশি দিয়ে কিনছেন ক্রেতারা। বর্তমানে মোটা চাল প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি ও সরু চাল, বিশেষ করে নাজিরশাইল ৯০ টাকা, মিনিকেট ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চিনিগুঁড়া চালের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। ভোজ্যতেলের বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬৫ থেকে ১৬৭ টাকা। বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৬৭ থেকে ১৭২ টাকায়। তবে খোলা আটার দাম কমে প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় নেমে এসেছে। চিনি ও মসুর ডালের বাজার এখনো তুলনামূলক চড়া; চিনি ১০৫ থেকে ১১৫ টাকা এবং মসুর ডাল ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়, দেশি রসুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, আমদানিকৃত রসুন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, আদা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
