ফরাসি তোপে চূর্ণ মরক্কোর স্বপ্ন
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা আর তারকাদের জ্বলে ওঠার নামই যেন ফ্রান্স। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস, একের পর এক আক্রমণ ব্যর্থ হওয়া এবং মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোর অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকলেও শেষপর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে দিদিয়ের দেশমের দল। বিরতির পর মাত্র ৬ মিনিটের ব্যবধানে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলের জোড়া গোলে মরক্কোকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ২০১৮ সালের শিরোপাজয়ী এবং ২০২২ সালের রানার্সআপ ফ্রান্স আবারো জানিয়ে দিল, বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে তাদের হারানো এখনো সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল ফরাসিদের হাতে। বলের দখল, পাসিং, আক্রমণ- সব দিকেই এগিয়ে ছিল তারা। ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই দাইয়ো উপামেকানোর হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। এরপর এমবাপ্পে, দেজিরে দুয়ে ও লুকাস দিনিয়ার একের পর এক প্রচেষ্টাও ব্যর্থ করে দেন তিনি। প্রথমার্ধের বড় সময়জুড়ে মনে হচ্ছিল, ফ্রান্সের বিপক্ষে একাই লড়ছেন বুনো।
২৫তম মিনিটে ম্যাচের বড় সুযোগ আসে ফ্রান্সের সামনে। বক্সের ভেতর এমবাপ্পেকে ফেলে দিলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। তবে ভিএআর যাচাইসহ দীর্ঘ বিরতির পর নেয়া স্পটকিকে প্রত্যাশামতো শট নিতে পারেননি ফরাসি অধিনায়ক। তার দুর্বল প্রচেষ্টা দারুণ দক্ষতায় আটকে দেন বুনো। জাতীয় দলের হয়ে টানা ১৫টি পেনাল্টি সফলভাবে নেয়ার পর এই প্রথম ব্যর্থ হলেন এমবাপ্পে। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, মরক্কো হয়তো আবারো বিশ্বকাপে নতুন কোনো রূপকথা লিখতে যাচ্ছে।
কিন্তু বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের গতি। প্রথমার্ধে পুরো দল নিয়ে রক্ষণ সামলানো মরক্কো গোলের খোঁজে কিছুটা ওপরে উঠে খেলতে শুরু করে। আর সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রক্ষণে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গা দারুণভাবে কাজে লাগায় ফ্রান্স। ম্যাচের ৬০তম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নিখুঁত ডান পায়ের শটে গোল করেন এমবাপ্পে। তার শটে বল দূরের পোস্টঘেঁষে জালে জড়ালে প্রথমবারের মতো উল্লাসে ফেটে পড়ে ফরাসি সমর্থকেরা। চলতি বিশ্বকাপে এটি তার অষ্টম গোল। এর মাধ্যমে গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসির সমতায় পৌঁছে যান তিনি। একই সঙ্গে তিনটি বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২০-এ। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমন কীর্তি গড়ে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল গোলদাতাদের কাতারে নিজের অবস্থান আরো শক্ত করেন।
প্রথম গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় আঘাত হানে ফ্রান্স। ৬৬তম মিনিটে এমবাপ্পের তৈরি করা আক্রমণ থেকে বক্সের বাইরে দুর্দান্ত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। গোলকিপার বুনো বলের নাগাল পেলেও জাল রক্ষা করতে পারেননি। চলতি বিশ্বকাপে এটি দেম্বেলের পঞ্চম গোল। মাত্র ৬ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোলেই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কো আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাতে ছিল না প্রয়োজনীয় ধার। পুরো ম্যাচে তারা খুব কম সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে এবং ফরাসি রক্ষণকে বড় কোনো পরীক্ষার মুখেও ফেলতে পারেনি। অন্যদিকে ফ্রান্স বলের দখল, আক্রমণের সংখ্যা, লক্ষ্যে শট এবং সুযোগ তৈরির প্রায় সব পরিসংখ্যানেই ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে। বিশেষ করে মিডফিল্ড থেকে দ্রুত আক্রমণে রূপ নেয়া, দুই প্রান্ত দিয়ে গতিময় ফুটবল এবং প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তারা ছিল অসাধারণ।
৭৭তম মিনিটে সামান্য শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করায় এমবাপ্পেকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ দিদিয়ের দেশম। মূল তারকাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। এরপরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতেই রাখে ফ্রান্স। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত মরক্কোকে আর ম্যাচে ফেরার কোনো সুযোগ দেয়নি তারা।
এই জয়ে নতুন একটি মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন দেশম। তার অধীনে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল ফ্রান্স। ২০১৮ সালে শিরোপা জয়, ২০২২ সালে রানার্সআপ এবং এবার আবারো শেষ চারে জায়গা করে নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘লে ব্লæ’রা। বড় ম্যাচে চাপ সামলানো, সুযোগ কাজে লাগানো এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ- এই তিন ক্ষেত্রেই ফ্রান্স ছিল মরক্কোর চেয়ে অনেক এগিয়ে।
অন্যদিকে মরক্কোর জন্য এটি ছিল হতাশার রাত। ইয়াসিন বুনো প্রথমার্ধে অসাধারণ গোলকিপিং করে দলকে লড়াইয়ে রাখলেও আক্রমণভাগ তাকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিতে পারেনি। আশরাফ হাকিমিদের রক্ষণ দীর্ঘ সময় দৃঢ় থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসি গতির সামনে ভেঙে পড়ে। বলের দখল বাড়ানোর চেষ্টা করেও কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। ফলে ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো এবারো ফ্রান্সের কাছে ২-০ ব্যবধানে হেরে থেমে গেল মরক্কোর স্বপ্ন।
ফরাসিদের এই জয় শুধু সেমিফাইনালে ওঠার নয়, বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো দৃঢ় করারো বার্তা। এমবাপ্পের নেতৃত্ব, দেম্বেলের দুর্দান্ত ফর্ম, শক্তিশালী মিডফিল্ড এবং অভিজ্ঞ কোচ দেশমের কৌশলে এবারো শিরোপার অন্যতম দাবিদার হয়ে রইল ফ্রান্স। আর মরক্কোর জন্য এই হার স্মরণ করিয়ে দিল, সাহস ও লড়াই যথেষ্ট হলেও বিশ্বকাপের শেষ দিকে যেতে হলে বড় মুহূর্তগুলো কাজে লাগানোর সামর্থ্যই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়।
