চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা, মহানগরীতে জলজট
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের পর বৃষ্টি কিছুটা কমলেও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসেনি। যদিও বৃষ্টি কিছুটা কমেছে কিন্তু জোয়ার ও খাল-নালা ময়লায় ভরাট থাকায়, জলাবদ্ধতার পানি কমতে সময় লাগায়, নগরের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে আছে। নগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল থেকে শুরু করে ব্যবসা কেন্দ্রগুলোও পানিতে ডুবে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে নগরের ঐতিহ্যবাহী রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে, যেখানে হাঁটু সমান পানিতেই ব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
গতকাল বুধবার রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী রানা দাশ জানান, তিনি সকালে কোনোভাবে বাজারে গিয়ে দেখেন- বাজারের অধিকাংশ গলি ও দোকানের সামনে হাঁটু সমান পানি জমে আছে। অনেক দোকানের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা মালামাল উঁচু স্থানে তুলে রাখছেন, কেউ বালতি দিয়ে পানি সেচছেন, আবার কেউ ভেজা পণ্য শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ফলে সকাল থেকেই ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি কিছুটা কমেছে, কিন্তু সকালে দোকানে এসে দেখি পুরো রিয়াজউদ্দিন বাজার এক হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পানি নেমেছে। তবে বাজারে তেমন কোনো ক্রেতা নেই। এদিকে পানিতে ভেজায় অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে শুধু রিয়াজউদ্দিন বাজার নয়, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, মোহরা, কুয়াইশ ও অক্সিজেনসহ নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় সড়ক, অলিগলি, ভবনের নিচতলা এবং দোকানপাটে পানি উঠে গেছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘরের চুলা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক রান্না-বান্নাও ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
জলাবদ্ধতার পানি ঢুকেছে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও হাসপাতালের নিচতলাতেও। পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রমও বন্ধ রেখেছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
জলাবদ্ধতা শুধু চট্টগ্রাম নগরীতেই নয়, নগরের বাইরেও বন্যার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে । মূলত, অতি বৃষ্টিতে নগরের বাইরেও দুর্যোগের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া ও সীতাকুণ্ডসহ প্রায় সব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কোথাও কোথাও মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। স›দ্বীপের সঙ্গে যাতায়াতও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৭ সালে ৪০৮ মিলিমিটার এবং ১৯৮৩ সালে ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিও এখনো বিদ্যমান।’
দুর্যোগের মধ্যেও আকাশপথে স্বস্তির খবর দিয়েছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল জানান, বুধবার কোনো ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব বা ডাইভার্ট হয়নি। বিমানবন্দরের নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা স্বাভাবিক রয়েছে।
অন্যদিকে পাহাড় ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র চালু রেখেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মেয়রের নির্দেশনায় ১০১ সদস্যের কুইক রেসপন্স টিম জলাবদ্ধতা নিরসন ও জরুরি সেবায় মাঠে কাজ করছে।
চট্টগ্রামে আরো বৃষ্টি-দুর্যোগের আশঙ্কা : সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের আট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকাশিত বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, পূর্ব-মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। তবে এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উত্তর বঙ্গোপসাগর, উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এ অবস্থায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরের কোথাও কোথাও সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা থেকে দিবাগত রাত ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য দেয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে এসব এলাকার নদীবন্দরকে ১ নম্বর পুনঃ ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
