উচ্চমাধ্যমিকের প্রশ্নে একের পর এক ভুল, কীসের ইঙ্গিত
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নে ভুল নতুন ঘটনা নয়। তবে একই পরীক্ষা মৌসুমে একাধিক বিষয়ে অভিযোগ ওঠা এবং একটি ক্ষেত্রে সরকারিভাবে ভুল স্বীকারের ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। চলমান উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নপত্রের ত্রæটি, অসংগতি এবং প্রশাসনিক ভুল নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে। পরীক্ষা চলাকালে একাধিক বিষয়ে প্রশ্নপত্র নিয়ে বিতর্ক সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কেননা, প্রশ্নপত্রের নির্ভুলতা শুধু একটি কারিগরি বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাষ্ট্রের মূল্যায়ন কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে সরকারিভাবে ভুল স্বীকার, রসায়নে অসংগতির অভিযোগ, জীববিজ্ঞানের বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের অমিল, উচ্চতর গণিতে প্রশ্নের ভাষা নিয়ে বিতর্ক এবং একটি কেন্দ্রে ভুল সিলেবাসের প্রশ্ন বিতরণের ঘটনা- সব মিলিয়ে এবারের পরীক্ষা ঘিরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, একটি প্রশ্নপত্র পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর আগে একাধিক স্তরের যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটলে তা কেবল ব্যক্তিগত ভুল নয়, বরং পুরো প্রশ্নপ্রণয়ন ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
বিতর্কের শুরু পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে : ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্রের ছবি ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, সৃজনশীল অংশের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে এমন ত্রæটি ছিল, যা পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছে। কোথাও তথ্য অসম্পূর্ণ, কোথাও প্রশ্নের উপাত্ত ও চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল বলে অভিযোগ করেন পরীক্ষার্থীরা।
প্রথমে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও পরে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি জানায়, সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেয়া হবে। এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও প্রশ্ন ওঠে যে, প্রশ্নটি পরীক্ষার আগেই একাধিক ধাপে যাচাই হওয়ার কথা, সেটি কীভাবে ভুলসহ পরীক্ষার হলে পৌঁছাল? ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড প্রশ্নপ্রণেতা, মডারেটরসহ ৪ জন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়। বোর্ড জানায়, কারো অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চেয়ে বেশি জরুরি হলো প্রশ্নপ্রণয়ন প্রক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা।
রসায়নের একাধিক প্রশ্ন নিয়ে আপত্তি : পদার্থবিজ্ঞানের পর রসায়ন দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষাও বিতর্কের
বাইরে থাকেনি। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীরা দাবি করেন, ৮টি সৃজনশীল প্রশ্নের মধ্যে ৪টিতে এবং একটি বহুনির্বাচনি প্রশ্নে ত্রæটি বা অসংগতি রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল বৈজ্ঞানিক পরিভাষার ভুল ব্যবহার, সূত্রের বর্ণনায় অসামঞ্জস্য এবং প্রশ্নের ভাষাগত বিভ্রান্তি। যদিও সরকারিভাবে সব অভিযোগ সত্য বলে ঘোষণা করা হয়নি, তবে শিক্ষা বোর্ডের কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ পৌঁছায় এবং গণমাধ্যমে আলোচনা হয়।
জীববিজ্ঞান- বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণে অমিল
জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রে বিশেষ করে ইংরেজি সংস্করণের কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন যে, বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের মধ্যে অর্থগত পার্থক্য রয়েছে। একই প্রশ্নের দুই ভাষায় ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ থাকলে মূল্যায়নের ন্যায্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।
উচ্চতর গণিত প্রশ্নের ভাষা নিয়েও বিতর্ক
উচ্চতর গণিত পরীক্ষার পরও কিছু প্রশ্নের ভাষা ও উপস্থাপনা নিয়ে শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান। যদিও বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ভুল স্বীকার করেনি, তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রশ্ন যদি একাধিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তবে সেটিও প্রশ্নপ্রণয়নের মানের ঘাটতি নির্দেশ করে।
কেন ঘটছে এমন ভুল?
শিক্ষা বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি প্রশ্নপত্র সাধারণত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। প্রশ্নপ্রণেতা প্রশ্ন তৈরি করেন। বিষয়ভিত্তিক মডারেটর তা যাচাই করেন। প্রয়োজনে সংশোধন করা হয়। বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রশ্ন মুদ্রণের জন্য পাঠানো হয়। এতগুলো ধাপ পেরিয়েও যদি ভুল থেকে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে- সমস্যা কি ব্যক্তিগত অবহেলায়, নাকি পুরো ব্যবস্থার কোথাও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে?
প্রশাসনিক ভুলে বিপাকে শতাধিক পরীক্ষার্থী
প্রশ্নের ভুলের পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনায়ও বড় ধরনের ত্রæটি ধরা পড়ে। বিভিন্ন কেন্দ্রে দেয়া হয়েছে আগের বছরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। গত শনিবার মনোবিজ্ঞান পরীক্ষায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার কারণে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালেরটা দিয়ে পরীক্ষা নেন শিক্ষকরা। পরে পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে গিয়ে প্রশ্ন মিলিয়ে দেখতে পান ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা স্ব স্ব কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপরে বিষয়টি ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ বোর্ড থেকে সমাধান করার আশ্বাস দেয়। এ ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার দায়ে ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজের কেন্দ্রসচিব মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন খানকে শোকজ করেছে উপজেলা প্রশাসন। পরে কেন্দ্রসচিব পরীক্ষায় দায়িত্বে থাকা তিন শিক্ষককে শোকজ করেছেন।
মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিলের ১০৬ জন শিক্ষার্থী। গত রবিবার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্র সচিবকে অবহিত করে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ।
এতে বলা হয়, গত ৩০ জুলাই এইচএসসি মনোবিজ্ঞান ১ম পত্র (তত্ত্বীয়, বিষয় কোড ১২৩) পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। ওই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের এমসিকিউ অংশে ২নং সেট ‘যমুনা’ এবং সৃজনশীল অংশে ২নং সেট ‘যমুনা’ দেয়া হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, দেশের অন্যান্য পরীক্ষা কেন্দ্রে এমসিকিউ’র জন্য ২নং সেট ‘যমুনা’ এবং সৃজনশীলের জন্য ‘নাফ’ সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষার্থীরা ভিন্ন প্রশ্নপত্রে সৃজনশীল পরীক্ষা দিয়েছে। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা অবগত। সরবরাহ করা প্রশ্নের আলোকেই খাতা মূল্যায়ন করা হবে। পরীক্ষার্থীদের এটি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
এর আগে ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ভূগোল প্রথম পত্র পরীক্ষার দিনও ভুলবশত সাতক্ষীরা সিটি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষা শুরুর প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর বিষয়টি ধরা পড়লে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ওই প্রশ্নপত্র ফিরিয়ে নেয়া হয়। পরে প্রথম পত্রের সঠিক প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে পরীক্ষা নেয়া হয়। এ ঘটনায় কেন্দ্র সচিবকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তারও আগে বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে ভুলবশত আগের বছরের সিলেবাসভিত্তিক প্রশ্নপত্র দেয়া হয়। পরে তদন্তে প্রশাসনিক অবহেলার প্রমাণ মেলে। এ ঘটনা দেখিয়েছে, শুধু প্রশ্ন তৈরিই নয়, বিতরণ ব্যবস্থাতেও আরো কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার হলে একটি ভুল প্রশ্ন শুধু নম্বরের বিষয় নয়। পরীক্ষা চলাকালে একটি ভুল প্রশ্ন অনেক শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে ভুল প্রশ্ন সমাধানের চেষ্টা করেন। পরে পূর্ণ নম্বর দেয়া হলেও পরীক্ষার সময় হারানো, মানসিক চাপ এবং আত্মবিশ্বাসের ক্ষতি আর ফিরে আসে না। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা শুধু মূল্যায়নের বিষয় নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
শিক্ষাবিদদের মতে
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, এইচএসসি পরীক্ষা হলো উচ্চশিক্ষা অর্জনের প্রথম ও প্রধান সোপান। এই ধরনের পরীক্ষা ভুল প্রশ্ন মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি মাত্র ভুলও লাখো পরীক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তার প্রত্যাশা, চলতি বছরের ঘটনাগুলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ভুল হিসেবে দেখবে না; বরং এগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নির্ভুল প্রশ্নপ্রণয়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তবেই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষাগুলোর প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রশ্ন প্রণয়নের আগে ও পরে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দিয়ে পুনঃযাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের প্রশ্ন আলাদা ভাষাবিশেষজ্ঞ দিয়ে মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রশ্নপ্রণেতা ও মডারেটরদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ চালু করা দরকার। ভুলের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই ধরনের ভুল বারবার করলে সংশ্লিষ্টদের বোর্ডের প্রশ্নপ্রণয়ন প্যানেল থেকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেয়ার নীতিমালা বিবেচনা করা যেতে পারে।
