×

খবর

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

৯০ ভাগ টেন্ডারই নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগ নেতা ইব্রাহীম-আকতার

Icon

রকি আহমেদ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

৯০ ভাগ টেন্ডারই নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগ নেতা ইব্রাহীম-আকতার

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রলীগের লোগো। ছবি: ভোরের কাগজ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কাজের টেন্ডারের ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন জবি শাখা ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজী এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম আকতার হোসাইন। সেসঙ্গে টেন্ডারপ্রতি ৮-১০ শতাংশ কমিশন আদায় করেন তারা। তাদের বিরুদ্ধে অন্য ঠিকাদারদের হুমকি দিয়ে ও চেক আটকে বিতাড়িত করা, ইস্যু সৃষ্টি করে জবি প্রশাসনকে জিম্মি করে টেন্ডার বাগানো এবং পরিকল্পনা পরিচালককে রাস্তায় কর্মীদের দিয়ে আটকে হুমকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। দেড় বছর আগে কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও জবি শাখা ছাত্রলীগের বেপরোয়া এই দুই নেতার দাপটে কার্যত অসহায় জবি প্রশাসন।

২০২২ সালের ১ জানুয়ারি ইব্রাহীম ফরাজীকে সভাপতি ও এস এম আকতার হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক করে জবি ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হয়। এরপর থেকে ক্যাম্পাসের সব কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে নেন শীর্ষ এই দুই নেতা।

প্রতিদ্ব›দ্বী অন্য ঠিকাদারদের বিতাড়িত করার অন্যতম উদাহরণ হাজী ট্রেড নামে প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার আজাদ হোসেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের কাজ পেয়েও ছাত্রলীগের ভয়ে করতে পারেননি। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ‘৫৭ লাখ টাকার মসজিদের কাজ আমরা ১০ শতাংশ কমে ৫১ লাখ টাকায় করতে টেন্ডার জমা দিই। তবে ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজী টেন্ডার প্রত্যাহারের জন্য হুমকি-ধমকি দিয়ে অনেক প্রেসার দিতে থাকে। ফোন করে ফরাজী বলেন, ক্যাম্পাসে আসতে পারবেন না। দেখে নেব কীভাবে কাজ করেন। পরে ওই কাজটি ছাত্রলীগ সভাপতির পছন্দের ব্যক্তিকে (সাখাওয়াত হোসেন প্রিন্স) ৫৭ লাখ টাকায় দেয়া হয়। অথচ আমরা কম খরচে কাজটি করতে চেয়েছিলাম।’ আগে কিছু কাজ পেলেও এখন জবি ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ করেন ঠিকাদার আজাদ হোসেন।

এছাড়া ১০ শতাংশ কমে টেন্ডার জমা দিয়েও মসজিদের একই কাজ না পাওয়া ঠিকাদার মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমি কাজ করতে চাই। কিন্তু ওরা (ফরাজী-আকতার) আমাকে চায় না। কারণ অন্য জায়গায় কমিশন বেশি পাচ্ছে। সভাপতি-সেক্রেটারির মতামত ছাড়া ক্যাম্পাসে কেউ কাজ করতে পারে না। কাজ করতে গেলে ওরা জেনে যায়। কর্মীদের দিয়ে ডিসটার্ব করায়।’ এরকম আরো দুই ঠিকাদার ছাত্রলীগের প্রভাবের কারণে টেন্ডারে আর অংশ নেন না বলে জানালেন। এছাড়া নতুন ক্যাম্পাসের প্রাচীর নির্মাণকারী ঠিকাদার আনোয়ার হোসেনের চেক আটকে ১০ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগও আছে জবি শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রকৌশলীও এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা ভোরের কাগজকে জানান, ছাত্রলীগের দুই নেতা ফরাজী ও আকতার টাকার হিসাবে কাজ ভাগ করে সাখাওয়াত হোসেন প্রিন্স আর কামরুল হাসান নামে দুই ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করান। বিনিময়ে টেন্ডারপ্রতি ৮-১০ শতাংশ কমিশন আদায় করেন তারা। সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজী নিজের ভাগের টেন্ডারের কাজ তার পছন্দের ঠিকাদার একই এলাকা ভোলা ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন প্রিন্সকে দিয়ে করান। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসাইন তার ভাগের টেন্ডারের কাজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসানকে দিয়ে করান। অতীতে এই দুই ঠিকাদারের রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন ফরাজী ও আকতার। এই দুই ঠিকাদার নিজেদের লাইসেন্স ছাড়াও কাজের ধরন অনুসারে অন্য কোম্পানির লাইসেন্স ভাড়া করে থাকেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জবি ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের পর থেকে আড়াই বছরের টেন্ডারের নথিপত্র এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, লাইসেন্স ভাড়া করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর নলকূপের জন্য ৯ লাখ টাকার টেন্ডার, বাংলা বিভাগের সংস্কারকাজের সাড়ে ৬ লাখ টাকার টেন্ডার, গণিত বিভাগের ইলেক্ট্রিক কাজের টেন্ডার, নাট্যকলা বিভাগের ভবনের ছাদের উপরে প্রায় ৩২ লাখ টাকার কাজের টেন্ডার, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাবের সরঞ্জাম কেনার ৫৫ লাখ টাকার টেন্ডার, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ভবন সংস্কারে প্রায় ১৮ লাখ টাকার কাজের টেন্ডার, মনোবিজ্ঞান বিভাগের ভবন সংস্কারে প্রায় ১৪ লাখ টাকার বড় বড় কাজের টেন্ডার পেয়েছেন আকতারের পছন্দের ঠিকাদার কামরুল।

অন্যদিকে সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজীর ভাগের টেন্ডার হিসেবে প্রিন্স কেন্দ্রীয় মসজিদ দ্বিতল করার জন্য ৫৭ লাখ টাকার টেন্ডার, দর্শন বিভাগের ভবন সংস্কারে প্রায় ২১ লাখ টাকার টেন্ডার, ২০২২, ২০২৩ ও ২২০৪ সালের ডেস্ক ক্যালেন্ডার ও ডায়রি মুদ্রণসহ বাঁধাই কাজের তিন বছরের টেন্ডার, ২০২২ সালে ছাত্রী হলে কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ফটোকপি মেশিন কেনার টেন্ডার, একই বছরে ১৩ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের পেপার সরবরাহের দুই লাখ ১৯ হাজার টাকার টেন্ডার, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সংস্কার ও ইলেক্ট্রিক কাজের টেন্ডার, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের নাম ফলক ও বসার জন্য কংক্রিটের বেঞ্চ তৈরির কাজের টেন্ডার, বিশ্ববিদ্যালয়ের আসবাবপত্র মেরামতের টেন্ডার, ছাত্রী হলে গ্রিল লাগানোর কাজ করেছেন ।

এসব টেন্ডারের অধিকাংশই সাবেক উপাচার্যদের সময়ে। তবে বর্তমান প্রশাসনের সময়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে সুবিধা করতে না পেরে নানা সময় ইস্যু সৃষ্টি করে আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসনকে চাপে ফেলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে আনার অভিযোগও রয়েছে এই দুই ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে রয়েছে অবন্তিকার আত্মহত্যার আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের কর্মী দিয়ে আন্দোলন ভিন্ন খাতে নিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকার নতুন ক্যাম্পাসের বালুর টেন্ডারের ওয়ার্ক ওয়ার্ডার নেয়া।

এছাড়া ভবিষ্যতে তারা নতুন ক্যাম্পাসে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার রাস্তা নির্মাণের কাজ পেতে শিক্ষার্থীদের মাঠে নামানোর পরিকল্পনা করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে টেন্ডার না পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সৈয়দ আহমেদকে রাস্তায় আটকে হুমকি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে সৈয়দ আহমেদ বলেন, ল²ীবাজার দিয়ে হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলাম। ৫-৬ জন পথ আটকে নিজেদের জবির ছাত্র পরিচয় দেয়। এরপর আমি যোগদানের পর টেন্ডার কেন ম্যানুয়ালি না দিয়ে ইজিপিতে দিই জানতে চায়। আমি কোনো রকম বুঝিয়ে চলে আসি। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা একা বাসায় না ফিরতে বলেন। ঠিকাদার কামরুল ও প্রিন্স যে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন কাজ পাচ্ছেন তা স্বীকার করেন জবির প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারীও। তিনি বলেন, টেন্ডার ছাড়লে অন্য ঠিকাদার আবেদন কম করে। অনেক ঠিকাদার টেন্ডার পেয়েও ক্যান্সেল করে দেয়। পরে আমাদের রিটেন্ডারও করতে হয়েছে। তিনি আরো জানান, বাংলা বিভাগে সংস্কার বা নাট্যকলা ভবনের ৩২ লাখ টাকার কাজ অন্য কোম্পানি পেলেও তা করছেন কামরুল।

অবশ্য টেন্ডার পেতে ছাত্রলীগের নেতারা সহায়তা করেন না বলে দাবি প্রিন্স কনস্ট্রাকশনের ঠিকাদার সাখাওয়াত হোসেন প্রিন্সের। তিনি বলেন, আমরা কাজ পাই ইজিপি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আমি এখানে রেগুলার ঠিকাদার। আরেক ঠিকাদার কেএস করপোরেশনের মালিক কামরুল হাসান বলেন, এই মুহূর্তে ক্যাম্পাসে আমার দুটি কাজ চলছে। নিয়ম মেনে আমরা কাজ করি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজী বলেন, ‘কাজ তো আমি করলেও করব, তুমি করলেও করবা। তারা করলে সমস্যা কী? কে কী বলল ওইডা শুনে লাভ নাই। তারা বিধিমোতাবেক টেন্ডার পায়, কাজ করে, বিল নেয়, শেষ।’ এদিকে এ বিষয়ে একাধিকবার ফোনে কল করা হলেও সাড়া না মেলায় সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসাইনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শাখা ছাত্রলীগের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান বলেন, ‘টেন্ডার বা নিয়োগ বাণিজ্যে ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মীর যুক্ত থাকার অবকাশ নেই। আমি এর আগে এই ধরনের কোনো অভিযোগ শুনিনি। কেউ এ ধরনের কোনো অপরাধ করে থাকলে ছাত্রলীগ ব্যবস্থা নেবে।’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

স্থানীয় নির্বাচনে আ.লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ নিয়ে যা বললেন উপদেষ্টা

স্থানীয় নির্বাচনে আ.লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ নিয়ে যা বললেন উপদেষ্টা

হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত

হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হত্যা: ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার ২

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হত্যা: ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার ২

কচুক্ষেতে কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ

কচুক্ষেতে কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App