মেঘনায় ‘হানি ট্র্যাপ চক্র’
মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা, মেঘনা (কুমিল্লা) থেকে
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
ছবি: কাগজ প্রতিবেদক
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় এক নারীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি কথিত ‘হানি ট্র্যাপ চক্র’-এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চক্রটির সদস্য সাবরিনা আক্তার ববি (২৪) কৌশলে এক ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে সম্পর্ক গড়ে তুলে পরবর্তীতে তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যান বলে অভিযোগে উঠে এসেছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুরে ভুক্তভোগী সাথী আক্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে ১৬ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি মেঘনা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে হানি ট্র্যাপ চক্রের সদস্য দুই নারী ও তাদের লাঠিয়াল পুরুষ সহযোগীসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
অভিযুক্তরা হলেন-উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ কান্দি গ্রামের আসলাম মিয়ার স্ত্রী সাবরিনা ইসলাম ববি (২৪), শিকিরগাঁও গ্রামের ইব্রাহীম মিয়ার মেয়ে রুমানা আক্তার জয়া (২৭) এবং তাদের সহযোগী মানিকারচর গ্রামের মহি উদ্দিনের ছেলে মো. হৃদয় (২৭)।
লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিকিরগাঁও গ্রামের সাথী আক্তার (২৩) তার সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মেঘনা থানায় একটি ধর্ষণ মামলা (মামলা নং-০৮) দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই সুদীপ্ত শাহীন। তদন্ত চলাকালে একাধিকবার পুলিশ তার বাড়িতে গিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ করে এবং আলামত সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। এর আগেই সাবরিনা ইসলাম ববি পরকিয়ার গোপন সম্পর্কের মাধ্যমে সাথীর স্বামীকে কৌশলে ফাঁদে ফেলে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে তার প্ররোচনায় ওই ব্যক্তি সাথী আক্তারকে ডিভোর্স দেন। ডিভোর্সের বেশ কিছুদিন পর উপজেলার পুকুরপাড় এলাকায় ‘দেখা করার কথা’ বলে ডেকে নিয়ে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে পরবর্তীতে মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় কারাভোগের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ১৭ মার্চ জামিনে মুক্তি পান।
এদিকে তদন্ত কর্মকর্তা বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়; তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হলে উল্টো তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই ধর্ষণের মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট সেননগর বাজার এলাকায় একা পেয়ে সাথী আক্তারকে চুলের মুঠি ধরে মারধর করা হয় এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় গত ৮ মার্চ বিকেলে সাথী আক্তারের বাড়ির সামনে সাবরিনা ইসলাম ববির হাতে তার ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন দেখতে পেয়ে তিনি সেটি উদ্ধার করেন। এর জেরে একই দিন সন্ধ্যায় সাবরিনা ও জয়া হৃদয় নামে আরেক সহযোগীকে নিয়ে সাথীর বসতঘরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। মোবাইল ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানালে হৃদয় তাকে মারধর করে ঘরের টিনের খুঁটির সঙ্গে সজোরে আঘাত করে, এতে তার কপাল ফেটে গুরুতর আহত হন। তার চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা তাকে খুন-গুমসহ বড় ধরনের ক্ষতির হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে ১০ মার্চ আবারও তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
এছাড়া অভিযুক্তদের অসামাজিক কার্যকলাপের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পুরো ঘটনাটি একটি সংঘবদ্ধ ‘ট্র্যাপ চক্র’-এর অংশ বলে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এই চক্রটি কৌশলে সম্পর্ক গড়ে তুলে ব্ল্যাকমেইল, অর্থ আত্মসাৎ ও সহিংসতার মাধ্যমে মানুষকে ফাঁদে ফেলে এবং এর প্রমাণ তার নিজের কাছেই রয়েছে।
ভুক্তভোগী সাথী আক্তার বলেন, গত ১৪ মার্চ বিকেলে ববি ও জয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুইজন গণমাধ্যমকর্মীর কাছে বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন বক্তব্য দেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দেখতে পান, তারা মেঘনা থানার সাবেক এসআই মো. সুদীপ্ত শাহীন ও বর্তমান এএসআই রাসেলকে জড়িয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, অভিযুক্তরা একটি সংঘবদ্ধ ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের সদস্য, যারা কৌশলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে জিম্মি করে অর্থ আদায় করে এবং এ কাজে হৃদয় নামের একজনকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংবলিত বিভিন্ন ছেলেদের সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিওও প্রচারিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাছাড়া ববি এর আগেও একই কৌশলে দুজনকে বিয়ের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে কাবিননামা আদায় করে পরবর্তীতে তাদের ডিভোর্স দেন এবং একইভাবে তাকে রেখেই তার স্বামীকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছেন। এরপর থেকে তারা তাকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনসহ প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করেন। এতে তিনি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান এবং নিজেকে ভীত ও আতঙ্কিত উল্লেখ করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানার প্রতি আবেদন জানান।
তিনি আরও বলেন, হানি ট্র্যাপ চক্রের এই দুই সদস্যের সঙ্গে এলাকার প্রভাবশালী নেতা-কর্মীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের কোনো দোষত্রুটি থাকলে দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বেআইনিভাবে কাউকে তার পৈতৃক সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করার অধিকার কারও নেই।
অপরদিকে ওই দুই নারীর বক্তব্য নেওয়া সাংবাদিকরা তাদের ব্যক্তিগত ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, তাদের দেওয়া বক্তব্যে অস্পষ্টতা ও গোপন উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা উল্লেখ করেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশের আগে অনুমতি নেওয়ার শর্ত চাপিয়ে দেয় বা না মানলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেয়, তাহলে বোঝা যায় উদ্দেশ্য সঠিক নয় এবং এতে সাংবাদিকদের জিম্মি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া তারা বলেন, মতের অমিল হলে সংবাদকর্মীকে ব্যবহার করে মানুষের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্ট্যাটাসগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এটি মূলত একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার।
অন্যদিকে বদলি হওয়া এসআই মো. সুদীপ্ত শাহীন বলেন, এই দুই নারী হানি ট্র্যাপ চক্রের সদস্য। তারা সাথী আক্তারের স্বামীকে কৌশলে ফাঁদে ফেলে সাবরিনা ইসলাম ববি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিয়ে করেন। মেঘনা থানায় যোগদানের পর তিনি জানতে পারেন, জয়া নামের ওই নারী মেঘনার আলোচিত সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তির নির্দেশে তৎকালীন ওসি ছমিউদ্দিনকে ট্র্যাপে ফেলে কলঙ্কিত করে বদলিতে ভূমিকা রাখেন। এই তথ্য শোনার পর থেকে তিনি নিজেও এই চক্রের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের ছত্রছায়ায় জয়া বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং কৌশলে সম্পর্ক গড়ে তুলে অর্থ আদায় করেন। এছাড়াও সাথী আক্তারের মামলার তদন্তে যুক্ত থাকায় তাকে ও রাসেল তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে হয়রানির চেষ্টা করছেন তারা। তবে এই ঘটনায় রাসেলকে অযথা জড়ানো হয়েছে।”
এএসআই রাসেল বলেন, তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কাছে কুরুচিপূর্ণ ও বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যদিও এ ঘটনায় তাকে জড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবে তাকে অহেতুক হয়রানি করায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে জয়া ও হৃদয়ের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানান তিনি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য ফোন করা হলে সাবরিনা আক্তার ববি কোনো মন্তব্য না দিয়ে তার স্বামীকে মোবাইলটি দিয়ে দেন, এরপর তার স্বামী সংবাদকর্মীর সঙ্গে কথা না বলে বাসার ঠিকানা জানতে চান। জয়া আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার বড় বোন ফোন রিসিভ করেন এবং জানান, জয়া বাসার নিচে গেছেন। হৃদয়কে ফোন করলে জয়া তার এলাকার বড় বোন দাবি করেন এবং সরাসরি কথা বলার কথা বলে তিনি ফোন রেখে দেন।
স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি জানান, এমন চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেকেই এর শিকার হতে পারে। তাছাড়া ভুক্তভোগী নারী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। প্রশাসনের কাছে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে মেঘনা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম ভোরের কাগজকে জানান, তিনজনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
