নোবিপ্রবি
কোনো পরিবেশবিদ নয়, বাবুর্চির হাতে সবুজ বিপ্লব
মোহাম্মদ সোহেল, নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম
ছবি: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাস
বৈশাখের দাবদাহে যখন চারদিক ক্লান্ত, ঠিক তখনই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে মিলছে এক টুকরো স্বস্তি। চারদিকে সবুজের ছায়া, গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাখির ডাক- এই স্নিগ্ধ পরিবেশের পেছনে রয়েছেন এক নীরব কারিগর। তিনি কোনো পরিবেশবিদ নন, বড় কোনো পদেও নেই; বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাধারণ বাবুর্চি মো. হারুন অর রশিদ।
ভাষাশহীদ
আবদুস সালাম হলের সামনে বটগাছের ছায়ায় বসে গল্প করছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। প্রায় এক যুগ আগে
লাগানো এই গাছটি এখন
প্রশান্তির আশ্রয়। এমন অসংখ্য গাছ ছড়িয়ে আছে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে। বট, অর্জুন, ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া থেকে শুরু করে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা, জলপাই, তাল, জামরুল, কাঠবাদাম ও চালতাসহ প্রায়
১৫ প্রজাতির ফলদ ও বনজ গাছ
শোভা পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচকানাচে।
এই
সবুজায়নের পেছনে একাই কাজ করে চলেছেন ৫৪ বছর বয়সী
হারুন অর রশিদ। ছোটখাটো
গড়নের এই মানুষটি নিজের
সীমিত আয়ের বড় একটি অংশ
ব্যয় করেছেন গাছ লাগানো ও পরিচর্যায়।
২০০৬ সালে মাস্টাররোলের ভিত্তিতে বাবুর্চির চাকরিতে যোগ দেন তিনি, পরে ২০১৪ সালে স্থায়ী হন। চাকরির পাশাপাশি শুরু করেন নিজের স্বপ্নের কাজ- বৃক্ষরোপণ। একটি জামরুল গাছ দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ পৌঁছেছে দেড় হাজারেরও বেশি গাছে।
ছবি: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা হল, ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হল, মসজিদ, মন্দির, শান্তিনিকেতন, বিবি খাদিজা হল এবং অভ্যন্তরীণ সড়কের পাশজুড়ে তিনি রোপণ করেছেন শত শত গাছ। বিশেষ করে প্রায় ছয় শতাধিক তালের আঁটি রোপণ করেছেন তিনি, যা ভবিষ্যতে বজ্রপাত প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখবে।
হারুন
অর রশিদ বলেন, “চাকরি শুরুর প্রথম দিকে চিন্তা করলাম, এখানে তো সারাজীবন থাকবো
না, তাই কিছু একটা করি। প্রথমে কিছু তালের আঁটি রোপণ করি, একই সঙ্গে একটি জামরুল গাছও লাগিয়েছিলাম। পরে দেখি, শিক্ষার্থী ও পাখিরা জামরুল
গাছের ফল খাচ্ছে। তখনই
অনুপ্রাণিত হয়ে আরও গাছ লাগানো শুরু করি। এই পর্যন্ত বিভিন্ন
প্রজাতির প্রায় ১৫০০ ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছ
এবং ৫ শতাধিক তাল
গাছ লাগিয়েছি। যতদিন এখানে থাকব, গাছ লাগিয়ে যাব।”
শুধু
গাছ লাগানোই নয়, সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যাও করেন তিনি নিজেই। তার এই উদ্যোগে ক্যাম্পাসে
গড়ে উঠেছে পাখির অভয়ারণ্য, তৈরি হয়েছে শীতল ছায়া আর পরিবেশের ভারসাম্য
রক্ষার এক নীরব আন্দোলন।
নোবিপ্রবি
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান হাসিব বলেন, “যেখানে মানুষ গাছ কেটে পরিবেশ ধ্বংস করছে, সেখানে আমাদের ক্যাম্পাসের বাবুর্চি মো. হারুন অর রশিদ প্রায়
দেড় হাজার গাছ লাগিয়ে নোবিপ্রবিকে সবুজ ক্যাম্পাসে পরিণত করেছেন।”
শিক্ষার্থীদের
অনেকেই স্নেহভরে তাকে ‘হারুন মামা’ বলে ডাকেন। তাদের ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যত গাছ দেখা
যায়, তার বড় অংশই তার
হাতে লাগানো। “একদিন তিনি থাকবেন না, কিন্তু এই গাছগুলো তাকে
স্মরণ করিয়ে দেবে”- বলছিলেন এক শিক্ষার্থী।
নোবিপ্রবির
হিসাব বিভাগের কর্মচারী কচি বলেন, “হারুনুর রশিদ বাবুর্চির পাশাপাশি একজন প্রকৃত পরিবেশপ্রেমী। তার এই অবদানের জন্য
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে সম্মাননা দিয়েছে। এমন উদ্যোগ চালিয়ে যেতে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।”
নোবিপ্রবির
পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান
বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার সময় এটি ছিল প্রায় বিরান ভূমি। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের পাশাপাশি হারুনুর রশিদ অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এখানে ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছ
লাগিয়েছেন। বিশেষ করে বজ্রপাত প্রতিরোধে তিনি পাঁচ শতাধিক তাল গাছ রোপণ করেছেন। এখন পুরো ক্যাম্পাসই সবুজ অরণ্যে পরিণত হয়েছে। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ
তাকে সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে।”
