ঝাঁকি জালের সেই দিন এখন স্মৃতি
রায়হান চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা)
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একসময় বর্ষা এলেই মুরাদনগরের নদী-খাল, বিল ও জলাশয়ের পাড়ে দেখা যেত ঝাঁকি জাল হাতে মাছ শিকারের চিরচেনা দৃশ্য। ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে জাল নিয়ে পানির ধারে ছুটতেন জেলে ও শৌখিন মাছ শিকারিরা। এক ঝটকায় পানিতে ছড়িয়ে পড়ত জাল, কিছুক্ষণ পর রশি টেনে উঠে আসত পুঁটি, চিংড়ি, শিংসহ নানা দেশি মাছ।
গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। দেশি মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি আধুনিক ও ক্ষুদ্র ফাঁসের জালের বিস্তারে মুরাদনগরে কমছে ঐতিহ্যবাহী ঝাঁকি জালের ব্যবহার।
গোমতী, তিতাস ও আর্সি নদীঘেরা এ উপজেলার নদী-খাল ও জলাশয়ে একসময় ঝাঁকি জাল ছিল মাছ ধরার পরিচিত উপকরণ। জেলেদের পাশাপাশি স্থানীয় অনেক মানুষ শখের বশেও এ জাল দিয়ে মাছ ধরতেন। কিন্তু আগের মতো মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলে এ জালের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। বিপরীতে নদী, খাল ও বিলে বেড়েছে ‘চায়না দুয়ারি’, ‘চায়না জাল’, ‘ম্যাজিক জাল’ ও ‘ঢলুক জাল’সহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ফাঁসের জালের ব্যবহার।
স্থানীয়রা বলেন, জলাশয় দূষণ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহারের কারণেও দেশি মাছ কমছে। ছোট ফাঁসের আধুনিক জালে মাছের পাশাপাশি পোনা আটকা পড়ায় মৎস্যসম্পদের স্বাভাবিক প্রজনন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
রামচন্দ্রপুর বাজারের ফিরুজ মিয়া বলেন, একসময় ঝাঁকি জাল দিয়ে অনেক মাছ ধরেছি। তখন জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ ওঠে না। তাই এই জালের ব্যবহারও কমে গেছে। ডুমুরিয়া গ্রামের জেলে সুজন বলেন, তিতাস নদীতে সারা দিন ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরলেও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মাছ পাওয়া যায়। এতে সংসার চালানো কঠিন। আবার ঝাঁকি জাল চালাতেও শারীরিক শক্তি লাগে। তাই এখন এ জালের চাহিদা আগের মতো নেই।
গাজীরহাট এলাকার জেলে হানিফ মিয়া বলেন, আধুনিক বিভিন্ন ধরনের জাল আসায় ঝাঁকি জালের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। একসময় এই জাল দিয়ে খাল-বিলে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা চালিয়েছি। দিন যত যাচ্ছে, পুরোনো সেই স্মৃতিগুলোও ততই মুছে যাচ্ছে।
সাংবাদিক মোশাররফ হোসেন মনির বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট, ম্যাজিক ও চায়না জালের অবৈধ ব্যবহার, অপরিকল্পিত কীটনাশক প্রয়োগ, জলাশয় দূষণ, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস ও মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার কারণে দেশি প্রজাতির মাছ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ঝাঁকি জালের মতো ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার পদ্ধতির ওপরও।
মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুরাদনগরের জলাশয়ে কমছে ঝাঁকি জাল হাতে মানুষের আনাগোনা। হারিয়ে যাচ্ছে শুধু একটি মাছ ধরার উপকরণ নয়, নদী-খাল ও বিলের সঙ্গে গড়ে ওঠা গ্রামীণ জীবনযাত্রার একটি পরিচিত দৃশ্যও। জলাশয়ের মাছ ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করা না গেলে এই ঐতিহ্যবাহী জাল একসময় হয়তো মুরাদনগরের মানুষের কাছে কেবল স্মৃতির অংশ হয়েই থাকবে।
