নীতিমালা জারির দুই সপ্তাহেই এলজিইডিতে ব্যত্যয়ের অভিযোগ
নিজ জেলাতেই বদলি নির্বাহী প্রকৌশলী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক প্রভাব, স্বার্থের সংঘাত এবং স্থানীয় প্রভাববলয় বন্ধে সম্প্রতি একটি কঠোর নীতিমালা জারি করেছিল সরকার। কিন্তু সেই নীতিমালার কালি শুকানোর আগেই এর বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। সদ্য জারি করা প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে তাঁর নিজ জেলায় পদায়নের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৬ জুলাই এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এলজিইডি সদর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) জাহানারা পারভীনকে টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ে বদলি করা হয়। অথচ সরকারি নথি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাহানারা পারভীন ও তাঁর স্বামী—উভয়েরই স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে।
অথচ এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, গত ২ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল—এলজিইডির কোনো কর্মকর্তাকে তাঁর নিজ জেলা কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর নিজ জেলায় কোনোভাবেই পদায়ন করা যাবে না। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং স্বার্থের সংঘাত এড়াতেই এই কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়। কিন্তু নতুন নিয়ম চালুর এত অল্প সময়ের মধ্যেই এ আদেশ নীতিমালার মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো, সড়ক, সেতু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এলজিইডি। সংস্থাটির বিশাল আর্থিক পরিধির কারণে নিজ জেলায় দায়িত্ব পালনকে প্রশাসনিক ঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখে আসছে সরকার। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন প্রজ্ঞাপন সত্ত্বেও পুরোনো ‘তদবির ও ম্যানেজ সংস্কৃতি’ এখনো বন্ধ হয়নি।
বিতর্কিত এই পদায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন নিজ ও স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইলে হওয়ার কথা স্বীকার করলেও নীতিমালার ব্যত্যয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, বদলিসংক্রান্ত এই নীতিমালার তোয়াক্কা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন জানান, এই আদেশ তাঁর নিজের সিদ্ধান্তে হয়নি। তিনি বলেন, “এলজিআরডি মন্ত্রীর নির্দেশেই এই বদলি করা হয়েছে। কোনো অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে এই আদেশ হয়নি। আমি প্রমাণ ছাড়া কোনো কাজ করি না।” তবে পদায়নটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর দেননি তিনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগেও একই নীতিমালার অধীনে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার আলম এবং নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামানকে নিজ জেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে সেই আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। একই ধরনের আদেশের ক্ষেত্রে দুই রকম মানদণ্ড প্রয়োগ হওয়ায় এলজিইডির সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, একটি সংস্কারমূলক নীতিমালার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শুরুদিকের কার্যকারিতার ওপর। একই নীতিমালায় কারও পদায়ন বাতিল করা হলেও অন্য কারও ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হলে সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এখন দেখার বিষয়, এলজিইডির এই নীতিমালা সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় কি না, নাকি বরাবরের মতো প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
