ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ নিয়োগ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু জীবনবৃত্তান্তের ভিত্তিতে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটির নিয়োগ ও পরবর্তী ছাঁটাই প্রক্রিয়া যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ পরিদর্শন কমিটি গঠন করে। চলতি বছরের এপ্রিলে গঠিত সাত সদস্যের ওই কমিটি তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি গভর্নরের কাছে জমা দেয়।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের মোট কর্মী ছিল ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে।
এই সময়ে বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা ছিলেন ৮ হাজার ৯৯ জন। শুধু পটিয়া উপজেলারই ছিলেন ৫ হাজার ১৪৮ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের পটিয়ার বাড়ি ও চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের অফিসে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার জন্য বাক্স রাখা হতো। এসব বাক্সে বিভিন্ন পদ ও এলাকার নাম উল্লেখ থাকত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল দৈবচয়নের ভিত্তিতে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১০ জন কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্যও নেয়। তাদের কয়েকজন জানান, পটিয়ায় সাইফুল আলমের বাড়ি ও আসাদগঞ্জ অফিসের বাক্সে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার পর সেখানেই মৌখিক পরীক্ষা ও যোগদানপত্র দেওয়া হয়। ওই ১০ জনের মধ্যে দুজনের মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান রয়েছে। এরপর যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা। লিখিত পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বরকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে ব্যাংকটির ২৭টি পদে বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে ২ হাজার ৭৮৯ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ), ২ হাজার ১৬০ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, ১ হাজার ৫৪৪ জন মেসেঞ্জার কাম গার্ড, ৯১৫ জন রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিমের (আরডিএস) স্টাফ এবং ৫০১ জন ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার নিয়োগ পান।
উচ্চপর্যায়ের পদেও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই দুজন এমডি, আটজন ডিএমডি, দুজন এসইভিপি ও একজন প্রিন্সিপাল নিয়োগ দেওয়া হয়। পাঁচজন ইভিপির মধ্যে চারজনও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ পান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) পদে নিয়োগের জন্য অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং আগের পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনকে আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা অবস্থায় ডিএমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন ও চারটি বহির্নিরীক্ষকের বিশেষ নিরীক্ষায় বিভিন্ন অনিয়ম চিহ্নিত হয়। এরপর ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ।
প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে মূল্যায়ন পরীক্ষার আওতায় আনা হয়। তাদের মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ৪ হাজার ৯৭১ জন অংশ নেননি। পরে বিভিন্ন কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা আরও ২৮৭ জনকে তালিকায় যুক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে, ১৫৫ জনের কক্সবাজার, ১০ জনের ঢাকা এবং ৮০ জনের বাড়ি ছিল অন্যান্য জেলায়।
এ ছাড়া পাঁচজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, বিভিন্ন অভিযোগে ১২১ জনকে চাকরিচ্যুত, চুক্তির মেয়াদ শেষে নবায়ন না করায় ১ হাজার ১৯০ জন এবং অন্যান্য কারণে ১৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তবে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন সমকালকে জানিয়েছেন, সব ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। নীতিমালা অনুসরণ না করে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের প্রবেশনারি অফিসারের ২৪তম ব্যাচে ১৯০ জনকে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১২ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পান।
এ ব্যাচের ৮৪০ জনের সিভি প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৭৬৩ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন এবং মাত্র ৩৬ জন ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পান। পরে শর্ত শিথিল করে ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে এবং ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১৪৪ জন এবং ২০২৪ সালের ২০০ জন প্রবেশনারি অফিসারের নিয়োগ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়েছে। ২০২৪ সালের ২০০ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার ছিলেন ৩৬ জন।
এদিকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকে প্রবেশিকা পর্যায়ের নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে এবং নিয়োগের পর সনদ যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে।
