লেপার্ড গেকোর খোলস বদলের অন্তরালে এক জীবনের পূর্ণচক্র
মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মরুভূমির নীরব বাসিন্দা, কিন্তু ঘরোয়া পোষ্য জগতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও চিতাবাঘের মতো দাগওয়ালা ছোট্ট এই সরীসৃপটির নাম লেপার্ড গেকো। দক্ষিণ এশিয়ার শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক অঞ্চলে, বিশেষ করে পাকিস্তান, ইরান, নেপাল, ভারত ও আফগানিস্তানের পাথুরে মরুভূমি ও তৃণভূমিতে এদের প্রাকৃতিক আবাস। আকারে ছোট, স্বভাবে শান্ত এবং সহজ পরিচর্যার কারণে বিশ্বের নানা দেশে এটি জনপ্রিয় পোষ্য প্রাণী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে শুধু পোষ্য হিসেবেই নয়, প্রকৃতিতেও এদের জীবনচক্র বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয়।
লেপার্ড গেকোর দৈর্ঘ্য সাধারণত ৭ থেকে ১০ ইঞ্চির মধ্যে। শরীরজুড়ে কালো বা গাঢ় বাদামি দাগ, যা চিতাবাঘের চামড়ার কথা মনে করিয়ে দেয় বলেই নামের সঙ্গে ‘লেপার্ড’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। বয়স কম থাকলে দাগের বদলে গাঢ় ব্যান্ড বা রেখা দেখা যায়; বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই রেখা ভেঙে দাগে পরিণত হয়। এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য মোটা, চর্বিযুক্ত লেজ। খাদ্যস্বল্পতার সময়ে এই লেজে সঞ্চিত চর্বিই তাদের শক্তির জোগান দেয়। বিপদের মুখে পড়লে লেজ ঝরিয়ে দিয়ে শত্রুর দৃষ্টি ভিন্নদিকে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে, যদিও পরবর্তীতে লেজ পুনরায় গজানোর পর আগের মতো নিখুঁত হয় না।
আরো পড়ুন: ইমরান খানের স্বাস্থ্যের অবনতি, হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত
আরো পড়ুন: আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি : আসিফ মাহমুদ
সরীসৃপ জগতের অনেক গেকোর চোখে স্থির স্বচ্ছ পর্দা থাকলেও লেপার্ড গেকোর রয়েছে চলমান চোখের পাতা। তারা চোখ বন্ধ করতে পারে, এমনকি ঘুমায়ও চোখ বুজে। নিশাচর স্বভাবের হওয়ায় সন্ধ্যা থেকে রাতই তাদের সক্রিয় সময়। দিনে তারা পাথরের ফাঁক, গর্ত বা আর্দ্র আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকে। মরু অঞ্চলের তাপমাত্রার তারতম্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য তাদের শরীরের গঠন অভিযোজিত।
খাদ্যতালিকায় থাকে মূলত কীটপতঙ্গ-ঝিঁঝিঁ পোকা, মিলওয়ার্ম, তেলাপোকা ইত্যাদি। শিকার ধরতে তারা দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শক্ত চোয়ালে ধরে ফেলে। পানির প্রয়োজন কম হলেও সম্পূর্ণ অনুপস্থিত নয়; আর্দ্র পরিবেশ ও সামান্য পানি তাদের সুস্থতার জন্য জরুরি। প্রকৃতিতে তারা একাকী থাকতে পছন্দ করে এবং নিজের এলাকা রক্ষা করে চলে।
লেপার্ড গেকোর জীবনচক্র শুরু হয় ডিম থেকে। স্ত্রী গেকো সাধারণত বছরে একাধিকবার ডিম পাড়ে, প্রতিবারে এক বা দুইটি ডিম। উষ্ণতা ও পরিবেশগত তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে প্রায় ৩৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ইনকিউবেশনের তাপমাত্রা অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারণে ভূমিকা রাখাসহ উচ্চ তাপমাত্রায় সাধারণত বেশি পুরুষ এবং তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় বেশি স্ত্রী বাচ্চা জন্মাতে দেখা যায়। জন্মের পরপরই বাচ্চারা স্বাবলম্বী; কয়েক দিনের মধ্যে প্রথমবার খোলস বদলায় এবং ক্ষুদ্র পোকামাকড় খেতে শুরু করে।
খোলস বদলানো বা মোল্টিং এদের জীবনের নিয়মিত অংশ। বেড়ে ওঠার সময় এটি ঘন ঘন ঘটে, প্রাপ্তবয়স্ক হলে ব্যবধান বাড়ে। খোলস ছাড়ার পর অনেক সময় তারা সেই পুরোনো খোলস খেয়ে ফেলে। এতে পুষ্টি পুনরুদ্ধার হয় এবং আশপাশে নিজেদের উপস্থিতির চিহ্নও কম থাকে। সুস্থ গেকোর ক্ষেত্রে খোলস বদলানো সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া; তবে আর্দ্রতার অভাবে কখনও কখনও আঙুল বা লেজে খোলস আটকে থাকতে পারে, যা পরিচর্যার ঘাটতির ইঙ্গিত।
গড় আয়ু প্রকৃতিতে তুলনামূলক কম হলেও সঠিক যত্নে বন্দিদশায় ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। শান্ত স্বভাব, কম শব্দ, কম জায়গায় বসবাসের সক্ষমতা এবং সহজ খাদ্যতালিকাসহ সব মিলিয়ে এটি নতুন পোষ্যপ্রেমীদের কাছেও গ্রহণযোগ্য। তবে যে কোনো প্রাণীর মতোই দায়িত্বশীল যত্ন, উপযুক্ত তাপমাত্রা, আলো-আঁধারি চক্র এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
লেপার্ড গেকোকে চেনার সহজ উপায় হলো-ছোট, দাগওয়ালা শরীর, মোটা লেজ, চোখে চলমান পাতা এবং ধীর-স্থির কিন্তু কৌতূহলী চলন। ভয় পেলে লেজ নাড়িয়ে সতর্কবার্তা দেয়। হাতে নিলে সাধারণত শান্ত থাকে, তবে হঠাৎ শব্দ বা দ্রুত নড়াচড়ায় ভড়কে যেতে পারে।
প্রকৃতির কঠিন পরিবেশে টিকে থাকা এই ছোট্ট সরীসৃপ আমাদের শেখায় অভিযোজনের গল্প। মরুর পাথুরে ফাঁক থেকে ঘরের কাচের টেরারিয়াম দুই জগতেই সে টিকে আছে নিজের স্বভাব, নীরবতা ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। ক্ষুদ্র দেহের ভেতর লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ জীবনচক্রের বর্ণিল অধ্যায়, যা জানলে বোঝা যায় প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একেকটি বিস্ময়।
