মতামত
ফারাক্কার লং মার্চ ও মওলানা ভাসানীর দূরদর্শী রাজনীতি
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম
মতামত: ফারাক্কার লং মার্চ ও মওলানা ভাসানীর দূরদর্শী রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নেতার সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাঁরা নিজেদের সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যৎকে দেখতে পেরেছিলেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন সেই বিরল রাজনীতিকদের একজন। তিনি শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব বুঝতেন না; তিনি বুঝতেন মাটি, মানুষ, নদী, কৃষি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক। তাই তাঁর রাজনীতি ছিল কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার রাজনীতি নয়, ছিল মানুষের বেঁচে থাকার রাজনীতি। ফারাক্কা লং মার্চ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আজ যখন ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য বিপন্ন হচ্ছে, তখন বারবার ফিরে আসে মওলানা ভাসানীর নাম। কারণ প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে তিনি যে বিপদের আশঙ্কা করেছিলেন, আজ তারই নির্মম বাস্তবতা দৃশ্যমান।
১৯৭৬ সালে যখন মওলানা ভাসানী ফারাক্কামুখী লং মার্চের ডাক দেন, তখন তাঁর বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সাধারণভাবে এমন বয়সে একজন মানুষের ঘরে বিশ্রামে থাকার কথা। কিন্তু ভাসানী ছিলেন ব্যতিক্রম। হাসপাতাল থেকে ফিরে তিনি ঘোষণা দেন, ভারত যদি বাংলাদেশকে ন্যায্য পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে তিনি ফারাক্কার দিকে লং মার্চ করবেন। সেই ঘোষণা শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; ছিল বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার আহ্বান।
১৯৭৬ সালের ২ মে তাঁকে প্রধান করে গঠিত হয় 'ফারাক্কা মিছিল পরিচালনা জাতীয় কমিটি'। এরপর দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। লং মার্চের আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে তিনি একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি ফারাক্কা সমস্যার রাজনৈতিক ও মানবিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি সংঘাত চাননি; তিনি চেয়েছিলেন ন্যায্যতা ও সংলাপ। এটাই ছিল তাঁর রাজনীতির অন্যতম সৌন্দর্য। প্রতিবাদে তিনি আপসহীন ছিলেন, কিন্তু বিদ্বেষে নয়।
১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হয় ৬৪ কিলোমিটারের ঐতিহাসিক লং মার্চ। হাজার হাজার মানুষ এতে অংশ নেয়। পরদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাইস্কুল মাঠে সমাবেশের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে। জীবনের শেষ বড় জনসমাবেশে ভাসানীর কণ্ঠে যে আর্তি শোনা গিয়েছিল, তা ছিল এক জনদরদী নেতার অন্তরের ভাষা- ‘আমি আর এই বয়সে তোমাদের জন্য কী করতে পারি? আমার ফরিয়াদ আল্লার দরবারে যেন পৌঁছায়…’। এই বাক্যে যেমন ছিল মানুষের জন্য সীমাহীন ভালোবাসা, তেমনি ছিল একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
লং মার্চ শেষে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, অফিসার পর্যায়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে সমাধানের পথ খুলতে। অভিন্ন ঐতিহ্যের দুই দেশের মানুষের স্বার্থে তিনি সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখানেই ভাসানীর দূরদর্শিতা স্পষ্ট। তিনি বুঝতেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর সমস্যা কেবল প্রকৌশলগত বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সহাবস্থানের প্রশ্ন।
ভাসানীর লং মার্চের প্রভাবও ছিল সুদূরপ্রসারী। এর পরের বছরই ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি পানি চুক্তি করতে বাধ্য হয়। সে চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার একটি গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও পরবর্তীকালে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি, তবু এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে ফারাক্কা প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন মওলানা ভাসানীই।
মওলানা ভাসানীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর দূরদৃষ্টি। আজকের মতো পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা পরিবেশগত ন্যায়বিচার তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় আলোচ্য বিষয় ছিল না। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, নদী শুকিয়ে গেলে শুধু পানি কমে না; ধ্বংস হয় কৃষি, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ফারাক্কার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়বে, নদী মরে যাবে, উত্তরাঞ্চল মরুকরণের ঝুঁকিতে পড়বে। আজ যখন পদ্মা ও গঙ্গার শাখা-প্রশাখা নদীগুলো মৃতপ্রায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট তীব্র, গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত, তখন মনে হয়- ভাসানী যেন ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন।
ভাসানী সম্পর্কে লেখক ও চিন্তাবিদ আহমদ ছফার একটি মূল্যায়ন আলোচনার দাবী রাখে। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের সর্বনাশ কোথায় ঘটছে, তা ভাসানীর চেয়ে স্পষ্ট করে আর কেউ বুঝতে পারেননি। কারণ তাঁর রাজনীতি ছিল মাটি ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতি করেননি; তিনি গ্রামবাংলার নদী, কৃষক, খেতমজুর ও প্রান্তিক মানুষের জীবনকে বুঝতেন। তাই তাঁর রাজনীতিতে নদী রক্ষার প্রশ্নও জাতীয় রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
বর্তমান সময়ের সঙ্গে ভাসানীর রাজনীতির তুলনা করলে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। আজকের রাজনীতিতে ক্ষমতা, নির্বাচন ও দলীয় কৌশল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, নদী, পানি ও পরিবেশের প্রশ্ন ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে পানি হবে সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক সম্পদ। এই বাস্তবতা ভাসানী অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, পানি প্রশ্নে আপস মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে আপস।
ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে মাওলানা ভাসানীর ভূমিকাকে অনেকেই ‘ভারত বিরোধী’ সংকীর্ণ দৃষ্টিতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে থাকেন, যা সঠিক নয়। দেখা গেছে, এই ব্যারাজ ভারতের জন্যও বড় সংকট তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদে নদীভাঙন, বিহারে ভয়াবহ বন্যা, গঙ্গার গতিপথের পরিবর্তন- সবকিছুই প্রমাণ করেছে যে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। ভারতের ভেতরেও আজ ফারাক্কা ব্যারাজের বিরোধিতা বিদ্যমান রয়েছে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার পর্যন্ত এটি ভেঙে ফেলার দাবি তুলেছেন। পরিবেশকর্মী মেধা পাটকরসহ বহু বিশেষজ্ঞও বলেছেন, ফারাক্কা এখন সুবিধার চেয়ে ক্ষতিই বেশি করছে। অর্থাৎ ভাসানীর
ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর অবশ্যম্ভাবনার যে আশঙ্কা থেকে এ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, ভারতসহ পুরো অঞ্চলের জন্যই সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
মওলানা ভাসানীর রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর নৈতিক সাহস। তিনি কখনো জনপ্রিয়তার হিসাব করে কথা বলেননি। পাকিস্তান আমলে যেমন তিনি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পরও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। তিনি বুঝতেন, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য মানে সরকারের প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়; বরং জনগণের অধিকার রক্ষাই প্রকৃত দেশপ্রেম।
নিজের রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সরল অথচ গভীর একটি স্বীকারোক্তি হলো- ‘কোনটা প্রগতিশীল, কোনটা বিপ্লবী- এসব যাচাই করে আমি কোনো দিন রাজনীতি করিনি। বরং আমি যা করেছি, তা বিশ্লেষণ করে আপনারা যা খুশি আখ্যা দিয়েছেন। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ আমার আসল দ্রষ্টব্য বিষয় হচ্ছে- কিসে মানুষের কল্যাণ নিহিত আছে এবং আমি ন্যায় ও সত্যের পথে আছি কি না।’
আজকের বাংলাদেশে ভাসানীকে নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন এখানেই। কারণ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন নদী হারাচ্ছে তার প্রবাহ, কৃষি হারাচ্ছে উর্বরতা, জলবায়ু পরিবর্তন উপকূলকে হুমকির মুখে ফেলছে, আর পানি প্রশ্নে আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় ভাসানীর মতো দূরদর্শী ও জনমুখী রাজনৈতিক দর্শন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
দুঃখজনকভাবে, আমরা প্রায়ই ভাসানীকে কেবল একটি রাজনৈতিক ধারার নেতা হিসেবে দেখার চেষ্টা করি। অথচ তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক এক ঐতিহাসিক চরিত্র। তিনি যেমন কৃষকের নেতা ছিলেন, তেমনি ছিলেন পরিবেশ-সচেতন রাজনৈতিক চিন্তারও অগ্রদূত। আজ যখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের কথা বলা হচ্ছে, তখন বোঝা যায়- বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে ভাসানী সেই বোধ অনেক আগেই ধারণ করেছিলেন।
ফারাক্কার লং মার্চ তাই কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ রক্ষার এক ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা। সেই লং মার্চ আমাদের শিখিয়েছে, নদীকে রক্ষা করা মানে কেবল পানি রক্ষা নয়; এটি সভ্যতা, কৃষি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন রক্ষার সংগ্রাম। ভাসানী সেই সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন বলেই নব্বই বছর বয়সেও অসুস্থ শরীরে রাজপথে নেমেছিলেন।
আজ ফারাক্কা দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- আমরা কি ভাসানীর সেই সতর্কবার্তা শুনতে পাচ্ছি? আমরা কি বুঝতে পারছি, নদী শুকিয়ে গেলে কেবল প্রকৃতি নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও বিপন্ন হয়? আমরা কি উপলব্ধি করছি, পানি কূটনীতি ও পরিবেশ রক্ষা আগামী দিনের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন?
মওলানা ভাসানীর রাজনীতি আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়- জনগণের জীবন ও প্রকৃতির স্বার্থের বাইরে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাঁর রাজনীতি ছিল মজলুম মানুষের পক্ষে, নদীর পক্ষে, প্রকৃতির পক্ষে। তাই তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি বাংলাদেশের বিবেকের অংশ।
ফারাক্কার বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারিত প্রতিবাদ আজও আমাদের পথ দেখায়। কারণ সময় যতই বদলাক, নদীর সত্য বদলায় না। আর সেই সত্য হলো- নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে।
লেখক: সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
