রক্তচাপ বৃদ্ধিতে কফির ভূমিকা কতটা?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
কফি স্বল্প সময়ের জন্য রক্তচাপ সামান্য বাড়াতে পারে—বিশেষত যারা নিয়মিত কফি পান করেন না বা আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে। তবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলেই যে কফি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আসল বিষয়টি হলো পরিমিত গ্রহণ এবং ব্যক্তিভেদে সহনশীলতার পার্থক্য।
উচ্চ রক্তচাপ কী?
হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করার সময় ধমনির দেয়ালে যে চাপ সৃষ্টি হয়, সেটিই রক্তচাপ। স্বাভাবিক রক্তচাপ বলতে বোঝায় সিস্টোলিক ১২০ মিলিমিটার এবং ডায়াস্টোলিক ৮০ মিলিমিটার।
যদি রিডিং বা মাপ নিয়মিত ১৪০/৯০ বা তার বেশি হয়, তবে একে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়।
রক্তচাপের মাপ জানা খুবই জরুরি। কারণ হাইপারটেনশনের কোনো লক্ষণ থাকে না। এটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কিডনি ও হার্টের রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৩১ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন, অথচ এদের অর্ধেকই জানেন না যে তাদের এই সমস্যা আছে। আবার যারা ওষুধ খাচ্ছেন, তাদের মধ্যেও প্রায় ৪৭ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই।
কফি কীভাবে রক্তচাপ প্রভাবিত করে?
কফিতে থাকা ক্যাফেইন পেশি উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এটি কিছু মানুষের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা 'অ্যারিদমিয়া' হতে পারে।
ক্যাফেইন অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়। এতে হৃদস্পন্দন দ্রুত হয় এবং রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায়।
এক কাপ কফি পান করার ৩০ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে রক্তে ক্যাফেইনের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ক্যাফেইনের প্রভাব শরীরে তিন থেকে ছয় ঘণ্টা থাকে। এই সময়ের মধ্যে রক্তে এর মাত্রা অর্ধেকে নেমে আসে।
তবে এই সময়সীমা বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং কফি পানের অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। যেমন শিশুদের লিভার ছোট ও অপরিণত হওয়ায় তারা ক্যাফেইন দ্রুত হজম করতে পারে না। আবার যারা নিয়মিত কফি খান, তাদের শরীর থেকে এটি দ্রুত বেরিয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কফি (পাশাপাশি কোলা, এনার্জি ড্রিংকস ও চকলেট) খাওয়ার পর সিস্টোলিক রক্তচাপ ৩-১৫ এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৪-১৩ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট বা লিভারের রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ বৃদ্ধি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো।
কফিতে আর কী থাকে?
কফিতে শত শত 'ফাইটোকেমিক্যাল' থাকে। এগুলো কফির স্বাদ ও গন্ধ তৈরির পাশাপাশি স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।
রক্তচাপের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন ফাইটোকেমিক্যালের মধ্যে রয়েছে মেলানোইডিনস। এটি শরীরের তরলের ভারসাম্য এবং এনজাইমের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে রক্তচাপ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
আরেকটি উপাদান হলো কুইনিক অ্যাসিড। এটি রক্তনালির আস্তরণ উন্নত করে সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
কফি কি হাইপারটেনশনের কারণ?
৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষের ওপর করা ১৩টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কফি পানের সঙ্গে হাইপারটেনশন বা স্থায়ী উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
গবেষণার সময়কালে ৬৪,৬৫০ জন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও গবেষকরা দেখেছেন, এর জন্য কফি দায়ী নয়। এমনকি লিঙ্গ, কফির পরিমাণ, ক্যাফেইনযুক্ত বা ক্যাফেইনমুক্ত-যেকোনো ভাবেই বিচার করা হোক না কেন, কফিকে হাইপারটেনশনের কারণ হিসেবে পাওয়া যায়নি।
তবে একটি জাপানি গবেষণায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে ১৮ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, যাদের রক্তচাপ খুবই বেশি (সিস্টোলিক ১৬০ বা তার বেশি, ডায়াস্টোলিক ১০০ বা তার বেশি), তারা যদি দিনে দুই কাপ বা তার বেশি কফি পান করেন, তবে তাদের হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তবে যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক বা সামান্য বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো ঝুঁকি দেখা যায়নি।
শেষ কথা
কফি একেবারে ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিজের রক্তচাপ, স্বাস্থ্যগত ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাস, লবণ গ্রহণ, বংশগতি ও শারীরিক পরিশ্রম-সব বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
পরিমিত কফি পান অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
