জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অব-প্যাক সতর্কীকরণ লেবেল: আর বিলম্ব নয়
রাখী গাঙ্গুলী
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
ছবি: এআই নির্মিত
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) এখন নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার ও স্থূলতার পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও। সাধারণ দৃষ্টিতে শরীর ও মনের স্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখা হলেও আধুনিক জনস্বাস্থ্য গবেষণা বলছে—অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এই উভয় সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্যই দায়ী অসংক্রামক রোগ, যার একটি বড় অংশই অকালমৃত্যু। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১১ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এই পরিসংখ্যান কেবল স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও মানবসম্পদের উন্নয়নের জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা।
মোড়কাজাত খাবার ও জোড়া সংকট
আজকের শহুরে জীবনযাত্রায় কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, বিস্কুট ও চিপসের মতো অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার (আলট্রা প্রসেজড ফুড) দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। এসব খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ এবং স্যাচুরেটেড বা ট্রান্স ফ্যাট থাকে। দীর্ঘদিন এসব খাদ্য গ্রহণ শুধু শারীরিকভাবেই ক্ষতিকর নয়, মস্তিষ্কে উদ্দীপনা ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
অতিরিক্ত চিনি: রক্তে গ্লুকোজের দ্রুত ওঠানামা ঘটিয়ে মেজাজের অস্থিরতা (মুড সুইং), ক্লান্তি এবং বিষন্নতার ঝুঁকি বাড়ায়।
অতিরিক্ত লবণ: উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও অনিদ্রার কারণ হতে পারে।
ট্রান্স ফ্যাট: মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডায়াবেটিস ও বিষন্নতার মধ্যে রয়েছে গভীর দ্বিমুখী সম্পর্ক। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিষন্নতার হার সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি; আবার বিষন্নতায় ভুগতে থাকা ব্যক্তির ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খেলে মনোযোগের ঘাটতি, অতিচঞ্চলতা (এডিএইচডি), আবেগ নিয়ন্ত্রণে অদক্ষতা সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে তাদের শিক্ষাজীবন ও বিকাশমান মানসিকতায়।
সমাধান: 'বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অফ প্যাক লেবেল'
এই বাস্তবতায় 'ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং' (এফওপিএল) বা খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কীকরণ লেবেল যুক্ত করা বিশ্বজুড়ে এক অত্যন্ত কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। চিলি, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো দেশগুলো প্যাকেটের সামনে বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ লেবেল চালু করে ভোক্তাদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে।
পণ্যের প্যাকেটের সামনে যদি বড় ও সহজ ভাষায় লেখা থাকে "অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি যুক্ত", "অতিরিক্ত মাত্রায় লবণ যুক্ত " কিংবা " অতিরিক্ত মাত্রায় সম্পৃক্ত চর্বি যুক্ত "তবে একজন ক্রেতা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের ও পরিবারের জন্য সঠিক খাবারটি বেছে নিতে পারেন।
বাংলাদেশেও এই নীতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। ভোক্তার পাওয়ার ও জানার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য পেলে সাধারণ মানুষ নিজের থেকেই ক্ষতিকর খাবার বর্জন করতে উৎসাহিত হবে। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। তবে শুধু মোড়কে লেবেল যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি কিছু বিষয় প্রয়োজন। যেমন:
১. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামে পুষ্টি শিক্ষার অন্তর্ভুক্তিকরণ।
২. শিশুদের লক্ষ্য করে প্রচার করা ক্ষতিকর খাদ্যের বিজ্ঞাপনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
৩. খাদ্য নিরাপত্তা, শারীরিক পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামোর আওতায় আনা।
ডব্লিউএইচও-এর মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। অসংক্রামক রোগের ব্যয়ভার বহনে সাধারণ পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ছে এবং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, একটি বড় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার।
শেষ কথা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অর্থ কেবল খাবারে ভেজাল রোধ করা নয়; বরং ভোক্তা যাতে জেনে-বুঝে স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন করতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা। ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) কেবল একটি লেবেল নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও সচেতন জাতি গঠনে মোড়কের সামনে বাধ্যবাধকতামূলক সতর্কীকরণ লেবেল বাস্তবায়নে আর কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই।
লেখক: রাখী গাঙ্গুলী, সিনিয়র সাইকোলজিস্ট ও অ্যাডিকশন প্রফেশনাল, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর, ঢাকা আহছানিয়া মিশন
