ভারতে বিজেপি নেতাসহ তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম
ফাইল ছবি
ভারতের ছত্তিশগড়ের কোরিয়া জেলায় বালু উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিবাদের জেরে বিজেপি নেতাসহ তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ফিল্মি কায়দার এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজন অভিযুক্তকে আটক করেছে জেলা পুলিশ। তবে তালিকাভুক্ত আরও পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) গভীর রাতের জেলার সোনহাট থানার নওগাইন গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় নয়জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন স্থানীয় বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) নেতা রয়েছেন। তার নাম ভরত সিং হলেও লাল্লা সিং নামে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। তিনি সাবেক জনপদ পঞ্চায়েত সভাপতি বলেও জানা গেছে।
হামলায় আহত বীরেন্দ্র সিং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহত অপরজন হলেন পেশায় শিক্ষক নাগেন্দ্র সিং। তিনি নিহত ভরত সিংয়ের চাচাতো ভাই। আহতদের মধ্যে মায়াঙ্ক সিং নামে আরও একজন বিলাসপুরের অ্যাপোলো হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার মাথা ও মুখে গুরুতর দগ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে।
নিহত বিজেপি নেতার পরিবারের দাবি, ভারত সিং বালু উত্তোলনসংক্রান্ত একটি বিবাদের মীমাংসার জন্য আলোচনা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে ডেকে নিয়ে মূলত ফাঁদে ফেলা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত বলে অভিযোগ তাদের। তাই ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের দাবিও জানিয়েছে পরিবার।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ভরত সিংয়ের পরিবারকে এলাকার বালু উত্তোলনের একটি চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, এরপর থেকেই সোনহাট, কৈলাশপুর, তেলিমুদা, বেলিয়া ও ছিঙ্গুড়াজুড়ে বালু পরিবহন এবং বালু উত্তোলন কার্যক্রম থেকে আসা ‘অবৈধ’ অর্থ আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক তিক্ত লড়াই শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভরত সিংয়ের গোষ্ঠী ও আরেক বিজেপি নেতা মনোজ ত্রিপাঠীর পরিবারের মধ্যে এই বিরোধ গত কয়েক মাস ধরে দানা বাঁধছিল।
জানা গেছে, বৈকুণ্ঠপুরে বালি পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত টিপার ট্রাকগুলোর মালিক ছিল ত্রিপাঠি পরিবার। অভিযোগ রয়েছে, খনি থেকে উত্তোলিত বালির নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য পরিশোধ নিয়ে বিরোধ আরও গভীর হয়। যা আগে একটি খনিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল, তা শিগগিরই প্রভাব, ভীতি প্রদর্শন এবং স্থানীয় আধিপত্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়।
তদন্ত কর্মকতা বলছেন, ভরত সিং ও অন্যদের বহন করা ফরচুনার গাড়িটি যাত্রাপথে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। গাড়িটির সামনে ও পেছনে ট্রাক দাঁড় করিয়ে পালানোর পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এর কিছুক্ষণ পরেই গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ভরত সিং গাড়ির ভেতরে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।
একসময় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকা ভরত সিং ভূপেশ বাঘেল সরকারের আমলে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি প্রায়শই হর্নযুক্ত একটি টয়োটা ফর্চুনার এসইউভি গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন, যা ছিল ওই এলাকার খনি নেটওয়ার্ককে ঘিরে থাকা ক্ষমতা ও ভয়ের প্রতীক। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আগুন লাগার সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুরেশা চৌবে বলেছেন, প্রাথমিক তদন্তে ত্রিপাঠি ও ঠাকুর গোষ্ঠীর মধ্যে বালু উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তার মতে, ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ওই এলাকায় পৌঁছালে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হাতাহাতি হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি জানান, চারজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিরা মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে পলাতক রয়েছে।
সোনহাট থানার এসএইচও বিনোদ পাসওয়ানও দুই পক্ষের মধ্যে বালু উত্তোলনসংক্রান্ত বিবাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, একপক্ষ ক্রাশার চালক লাল্লা সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, আর অন্য পক্ষ ত্রিপাঠি পরিবার। এই বিবাদকে কেন্দ্র করে আগেও মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
এসএইচওর মতে, লাল্লা সিং কিছু সময়ের জন্য অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ রেখেছিলেন, কিন্তু সম্প্রতি সেই কাজ আবার শুরু হয়েছে। ঘটনার কয়েকদিন আগে মায়াঙ্ক সিং ত্রিপাঠি পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর একটি মামলা দায়ের করা হয়।
স্থানীয় রাজনীতিতে তোলপাড়
বিজেপি নেতাকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যার এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বিধায়ক ভাইয়ালাল রাজওয়াড়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, কোরিয়া জেলার ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। তিনি বলেন, আগেও দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদের খবর পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু কী পরিস্থিতিতে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।
সাবেক বিধায়ক গুলাব কামরোও এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন। ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই বলেছেন, কোরিয়ার ঘটনাটি তার নজরে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং দোষীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
