×

আন্তর্জাতিক

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

এক ইরান যুদ্ধেই বদলে যাচ্ছে পুরো এশিয়া

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

এক ইরান যুদ্ধেই বদলে যাচ্ছে পুরো এশিয়া

ছবি : সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো এশিয়াজুড়ে। জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা এখন অঞ্চলটির বহু দেশের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর কমানো এবং সম্ভব হলে বাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। মূলত যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শুধু ভারত নয়, এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশও নাগরিকদের ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিচ্ছে। থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশ শুরুতে জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও এখন তারাও বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধ অঞ্চলটির অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি

পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের মতো দেশে জ্বালানির দামে সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় মূল্য দ্রুত বেড়ে গেছে। তবে শুধু দাম নয়, সরবরাহ সংকটও এখন বড় উদ্বেগের কারণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার হাতে মাত্র তিন সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রয়েছে, আর ভিয়েতনামের মজুত এক মাসেরও কম।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় অনেক পেট্রোল পাম্পে ডিজেলের সংকট তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, কখনো কখনো মাত্র দুই লিটার ডিজেল পেতে তাকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এর ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

ডিজেলের পাশাপাশি সারের সংকটও বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর পর ইউরিয়ার দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। কারণ, এই সারের বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলেই উৎপাদিত হয়।

খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

এশিয়ার লাখো ধানচাষি রোপণ মৌসুম শুরু করলেও বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেকে চাষের পরিমাণ কমানোর কথা ভাবছেন।

ফিলিপাইনের ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. আলিশের মিরজাবায়েভ সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে চাল উৎপাদন লাভজনকতার সংকটে রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এটি খাদ্য নিরাপত্তার বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

শিল্প খাতেও চাপ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রাখে। শিল্পমালিকদের দাবি, ডিজেল ও পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক রংয়ের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

একটি শিল্প সংগঠনের তথ্যমতে, সামগ্রিক কারখানা উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

জাপানের খাদ্যপ্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ক্যালবি ন্যাফথার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমাতে এখন সাদা-কালো প্যাকেট ব্যবহার করছে। ন্যাফথা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল।

এদিকে ন্যাফথা সংকটের কারণে এশিয়ার কয়েকটি প্লাস্টিক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে, অর্থাৎ তারা চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না।

অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

ফিলিপাইনে এপ্রিল পর্যন্ত বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২ দশমিক ৮ শতাংশে, যা মহামারির পর সর্বনিম্ন।

জাতিসংঘের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি হতে পারে।

জ্বালানি ও সার ভর্তুকির কারণে সরকারগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। ভারতে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি রোপণ মৌসুমে সার ভর্তুকিতে আরও প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে।

ইন্দোনেশিয়াও প্রতিদিন প্রায় ৬ কোটি ডলার জ্বালানি ভর্তুকি দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের হিসাবে, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে থাকলে এশিয়ার দেশগুলোকে বছরে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ ভর্তুকিতে ব্যয় করতে হতে পারে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়াতে পারে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় যে পরিস্থিতিতে সরকার পতন হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি অনেক দেশের জন্য একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে।

বিকল্প জ্বালানি ও নতুন কৌশল

সংকট মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলো এখন বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে। থাইল্যান্ড ব্রাজিল ও লিবিয়ার মতো দেশ থেকে বেশি তেল আমদানি শুরু করেছে। অনেক দেশ জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে এবং সিঙ্গাপুর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

তবে এই সংকটে কিছু দেশ লাভবানও হচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার বড় রপ্তানিকারক অস্ট্রেলিয়া এখন জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়েছে। দেশটি ব্রুনেই, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন জ্বালানি চুক্তি করেছে।

চীনও কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক হলেও তাদের বিশাল তেল মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে চীন সৌর প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন রপ্তানির পাশাপাশি পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল রপ্তানির অনুমতিও বাড়িয়েছে।

প্রথম চালানগুলো ভিয়েতনাম ও লাওসে যাচ্ছে, যাদের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও এখন চীনের সহায়তা নিতে হচ্ছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বেইজিং সফরে গিয়ে জেট ফুয়েল সরবরাহ নিয়ে চুক্তি করেন।

আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ

সংকটের মধ্যেও এশিয়ার দেশগুলো এখন পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখছে। সম্প্রতি ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা যৌথ জ্বালানি মজুত গঠনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এ ছাড়া ৩ মে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২০৩৫ সালের মধ্যে এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিড সংযুক্ত করতে ৫০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগ জ্বালানির খরচ কমাতে এবং নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার দেশগুলো বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চললেও বর্তমান সংকট তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে। হাজার মাইল দূরের যুদ্ধ যখন পুরো অঞ্চলকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতাকেই এখন তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মোহামেডানের বোর্ড সভায় ফুটবলের দলগঠনসহ বেশিকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

মোহামেডানের বোর্ড সভায় ফুটবলের দলগঠনসহ বেশিকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

ডিএমপির নতুন কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

ডিএমপির নতুন কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন ঢাকা উত্তরের সদস্য সচিব

এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন ঢাকা উত্তরের সদস্য সচিব

সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, নারী-পুরুষ-শিশুসহ আটক ১৪

জৈন্তাপুর সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, নারী-পুরুষ-শিশুসহ আটক ১৪

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App