বিক্ষোভে উত্তাল ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
ছবি- সংগৃহীত
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে কট্টরপন্থী হারেদি সম্প্রদায়ের পুরুষদের বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিরুদ্ধে দেশটিতে তীব্র গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে হাজার হাজার হারেদি ইহুদি রাস্তায় নেমে এসে দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রধান মহাসড়ক ও আয়ালন মহাসড়কসহ প্রধান প্রধান রেলপথ অবরুদ্ধ করে রাখেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ‘জেরুজালেম ফ্যাকশন’ নামের একটি কট্টরপন্থী ধর্মীয় সংগঠনের ডাকে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত দুজন ব্যক্তি গাড়ির ধাক্কায় আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধও রয়েছেন।
গাজায় চলমান যুদ্ধ ও বহুমুখী সংঘাতের কারণে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যখন তীব্র জনবল সংকটে ভুগছে, ঠিক তখনই এই বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা প্রতিরোধী বিক্ষোভ দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
মূলত গত সপ্তাহে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি চিফ নোয়াম সোলবার্গের বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ করার সময় সামরিক সেবায় যোগদানে অনিচ্ছুক ১৯ জন হারেদি তরুণকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার প্রতিবাদে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। বৃহস্পতিবারের এই বিক্ষোভে অংশ নিতে জেরুজালেম ও বেইত শেমেশসহ বিভিন্ন হারেদি অধ্যুষিত এলাকা থেকে লোকজনকে বাসে করে কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নিয়ে আসা হয়।
এদিন সন্ধ্যায় রাজধানী তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে জনপ্রিয় শিল্পীদের কনসার্ট থাকায় সড়কে আগে থেকেই অতিরিক্ত চাপ ছিল। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ায় পুলিশ আগেই সাধারণ মানুষকে কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর বিক্ষোভকারীরা হঠাৎ রেললাইনে নেমে পড়লে তেল আবিবে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, জেরুজালেম থেকে তেল আবিবগামী একটি ট্রেনের শত শত যাত্রীকে মাঝপথে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে নামিয়ে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। অবশ্য গভীর রাতে পুলিশ জানায়, মহাসড়কগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে এবং জেরুজালেম ফ্যাকশনের নেতারা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রায় ৬০ হাজার সদস্যের এই প্রভাবশালী সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরেই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (ইয়েশিভা) শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। সেনা নিয়োগ এড়ানোর কারণে তাদের সম্প্রদায়ের কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে সংগঠনটি দ্রুত দেশজুড়ে এমন বিশৃঙ্খলা ও বিক্ষোভের সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হারেদি সম্প্রদায়ের এই সেনা নিয়োগবিরোধী আন্দোলন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বুধবারও দেশের বিভিন্ন শহরের কারাগারের সামনে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় জেরুজালেমে পুলিশের ওপর হামলা, বস্তু নিক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের উচ্চ আদালত এক ঐতিহাসিক রায়ে জানায় যে, হারেদি পুরুষদেরও দেশের অন্য নাগরিকদের মতো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অংশ নিতে হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া বহুমুখী যুদ্ধে সেনাবাহিনীর জনবল সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠায় এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বারবার জনবল ঘাটতির কথা জানালেও হারেদি নেতারা সামরিক সেবার পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষাকে সমমানের রাষ্ট্রীয় সেবা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় জীবনধারার জন্য বড় হুমকি।
উচ্চ আদালতের রায়ের পর গত দুই বছরে সেনাবাহিনী হারেদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের কাছে হাজার হাজার নিয়োগপত্র পাঠালেও অধিকাংশ তরুণই তা পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ এখন আইনগতভাবে ‘নিয়োগ এড়ানো ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, যা তাঁদের যেকোনো সময় গ্রেপ্তার বা আইনি শাস্তির মুখোমুখি করার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
