‘অশিক্ষিতরা দেশ চালাচ্ছেন’
হামলার শিকার হয়েও সমাবেশে সরব ‘তেলাপোকা’ দলের প্রধান
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ‘তেলাপোকা’ দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অভিজিৎ দিপকে। অভিযোগ রয়েছে, সমাবেশস্থলে প্রবেশের সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সোমবার (১৬ জুন) জয়পুরের শহীদ স্মারকে সিজেপির প্রথম বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় ঘটনাটি ঘটে। সমর্থকদের কাঁধে চড়ে মঞ্চের দিকে যাওয়ার সময় দিপকে উপস্থিত জনতাকে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই কয়েকজন ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর মঞ্চে উঠে দিপকে বলেন, সমাবেশস্থলে প্রবেশের সময় তার ওপর হামলা হয়েছে। তবে এমন হামলায় তারা প্রতিশোধমূলক কোনো পথ বেছে নেবেন না। তার ভাষায়, শক্তির বদলে সহিংসতার আশ্রয় নেয় দুর্বলরাই।
সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হামলাকারীদের ওপর যেন কেউ আক্রমণ না করে। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে বারবার হামলার শিকার হবেন, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে নন।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ঘোষণা
দিপকে দাবি করেন, হামলা চালিয়ে তার কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময়ও তিনি সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবেই চলবে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, শান্তি ও অহিংসার পথেই তারা নিজেদের দাবি তুলে ধরবেন। তিনি নিজেকে মহাত্মা গান্ধী ও ড. বি. আর. আম্বেদকরের আদর্শের অনুসারী বলেও উল্লেখ করেন।
হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা অভিযোগ করেন, হামলায় জড়িতরা একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের কর্মী। তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা প্রকাশ করা হবে।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া রাকেশ গুর্জর পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার সময় দাবি করেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। নিজেকে জাতীয়তাবাদী পরিচয় দিয়ে তিনি দিপকের বিরুদ্ধে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তোলেন। তবে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে কংগ্রেস দিপকের ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।
জয়পুরের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) রাজর্ষি রাজ বর্মা বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি দিপকেকে আঘাত করে সমাবেশের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে।
তিনি জানান, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৭০ ধারায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন- রোহিত শর্মা (২৫), রাকেশ গুর্জর (৩০), অজয় শর্মা (২৫), কুলদীপ সিং শেখাওয়াত (২৭) ও নিকেত (২৮)।
এ ঘটনায় সিকিম থেকে সমাবেশে অংশ নিতে আসা ভবেশ অধিকারী নামের আরেক ব্যক্তি লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাতাহাতির সময় তার মোবাইল ফোনও হারিয়ে যায়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ক্ষোভ
সমাবেশের শুরুতে বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে মানসিক চাপে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
পরে বক্তব্যে দিপকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সুরক্ষিত রাখতে না পারলে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
সিবিএসই বোর্ডের ফলাফল নিয়ে অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের অর্থ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা অন্যায্য। তার মতে, যদি মূল্যায়নে ভুল হয়ে থাকে, তাহলে তা সংশোধনের দায় সরকারের, শিক্ষার্থীদের নয়।
‘অশিক্ষিতরা দেশ চালাচ্ছেন’
সরকারের নীতিনির্ধারকদের সমালোচনা করে দিপকে বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যার গভীরতা তারা বুঝতে পারছেন না। তার অভিযোগ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের অনেকেই শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন। এ প্রসঙ্গেই তিনি মন্তব্য করেন, ‘অশিক্ষিতরা দেশ চালাচ্ছেন, তাই পরীক্ষাগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, অনলাইন পরীক্ষার সময় প্রায়ই প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা যায়, কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এমন সমস্যা দেখা যায় না। তার ভাষায়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের প্রশ্নে বারবার অব্যবস্থাপনা দেখা গেলেও অন্য ক্ষেত্রে এমন ব্যর্থতা খুব কমই চোখে পড়ে।
শিক্ষামন্ত্রীকে কটাক্ষ
রাজস্থানের শিক্ষামন্ত্রী মদন দিলওয়ারের একটি মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন দিপকে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকে তুলনামূলকভাবে ছোট ঘটনা হিসেবে দেখার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকদের নিজেদের সন্তানরা যদি একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতো, তাহলে তারা বিষয়টিকে এত হালকাভাবে নিতেন না।
তিনি দাবি করেন, অনেক রাজনৈতিক নেতার সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করেন, ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যার বাস্তবতা তারা উপলব্ধি করতে পারেন না।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বিভাজনের রাজনীতি
বক্তব্যে দিপকে রাজস্থানের একটি সরকারি স্কুল ভবন ধসে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানরা সেখানে পড়লে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবস্থা কি একই থাকত?
তিনি আরো বলেন, সাধারণ মানুষের জীবন ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করা হচ্ছে।
দিপকের দাবি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তে বিভেদমূলক রাজনীতি বর্তমানে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
নতুন কর্মসূচির ঘোষণা
সমাবেশের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে আগামী ২০ জুন দিল্লিতে অনির্দিষ্টকালের আন্দোলনের ঘোষণা দেন দিপকে। তিনি সমর্থকদের বৃহৎ সংখ্যায় ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জয়পুর পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী সমাবেশে সর্বোচ্চ ৮০০ জনের উপস্থিতির অনুমতি ছিল। ‘শান্তিপূর্ণ প্রদর্শন’ লেখা ব্যানারের নিচে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক, ইউটিউবার ও সমর্থকের উপস্থিতি দেখা যায়।
দিপকের আগমনের আগে জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী চেতনার গান পরিবেশন করা হয়। এ সময় সমর্থকদের হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা, আম্বেদকরের ছবি এবং সংবিধানের অনুলিপি দেখা যায়।
