শিরোপা ধরে রাখার মিশনে সকালে মাঠে নামছে মেসির আর্জেন্টিনা
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম
ফাইল ছবি
বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ছয় দিন আগে। কিন্তু অনেকের কাছে আসল অপেক্ষা ছিল বুধবারের (১৭ জুন) জন্য। কারণ এই দিন যে মাঠে নামছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আর তাঁদের সামনে থাকবেন লিওনেল মেসি—নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে, আরও একবার ইতিহাসের মঞ্চে।
গ্রুপ ‘জে’র প্রথম ম্যাচে কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া। বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৭টায় শুরু হবে ম্যাচটি। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের চার বছর পর শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করবে লিওনেল স্কালোনির দল।
আর্জেন্টিনার লক্ষ্য শুধু প্রথম ম্যাচ জেতা নয়। তারা চাইছে ইতিহাসের খুব কঠিন এক পথ পাড়ি দিতে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা দুটি শিরোপা জিতেছে মাত্র দুটি দেশ—ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে, ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে। ব্রাজিলের পর আর কোনো দল বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারেনি। মেসিদের সামনে তাই ৬৪ বছরের অপেক্ষা ভাঙার চ্যালেঞ্জ।
মেসির জন্য ম্যাচটি আলাদা। মাঠে নামলে তিনি প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি পুরুষ বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড গড়বেন। একই সঙ্গে এটি হতে পারে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ২৪ জুন ৩৯ বছরে পা দেবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বয়স, চোটের ছোটখাটো সমস্যা, ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়—সবকিছু পেছনে রেখেই আবার বিশ্বকাপ মঞ্চে ফিরছেন তিনি।
স্কালোনির জন্য স্বস্তির খবর, মেসি সাম্প্রতিক মাংসপেশির টান কাটিয়ে উঠেছেন। আর্জেন্টিনার প্রস্তুতি ম্যাচে হন্ডুরাসের বিপক্ষে বেঞ্চে থাকলেও আইসল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি নেমে পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন তিনি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর শুরু থেকে খেলার সম্ভাবনাই বেশি।
আর্জেন্টিনার দলে ধারাবাহিকতা আছে। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী দলের ১৭ জন ফুটবলার এবারও স্কোয়াডে আছেন। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লাউতারো মার্তিনেজ—মূল কাঠামো প্রায় অক্ষত। এই ধারাবাহিকতাই স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবে সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আছে বয়সের প্রশ্নও। আর্জেন্টিনা এবারের টুর্নামেন্টের তুলনামূলক বয়স্ক দলগুলোর একটি। মেসি ও নিকোলাস ওতামেন্দির অভিজ্ঞতা বড় সম্পদ, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের শারীরিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। আনহেল দি মারিয়ার বিদায়ের পর নতুন ভারসাম্য, রোমেরোর চোট কাটিয়ে ফেরা, তাগলিয়াফিকোর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার চেহারা আগের মতো শক্তিশালী হলেও নিখুঁত নয়।
গোলপোস্টে ফিরছেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। ডান হাতের আঙুলের চোট কাটিয়ে তিনি খেলতে প্রস্তুত। তবে বাঁ দিকের রক্ষণে অনিশ্চয়তা আছে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে নিয়ে। কাফ চোটের কারণে আলজেরিয়া ম্যাচে তাঁর খেলা নিয়ে সংশয় আছে। তাঁর জায়গায় ফাকুন্দো মেদিনা বা লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ব্যবহার করতে পারেন স্কালোনি।
রক্ষণে আরেক প্রশ্ন ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে ঘিরে। টটেনহামের হয়ে মৌসুমের শেষ অংশে হাঁটুর চোটে বাইরে ছিলেন তিনি। এখন ফিট হলেও ম্যাচের ছন্দে কতটা আছেন, সেটি দেখার বিষয়। তাঁর পাশে ওতামেন্দি নাকি লিসান্দ্রো—সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্কালোনিকে।
মাঝমাঠে বড় চমক নেই। দে পল, এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টার আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র। আনহেল দি মারিয়ার বিদায়ের পর এবার থিয়াগো আলমাদার দায়িত্ব বাড়ছে। তাঁকে আক্রমণ ও মাঝমাঠের সংযোগ তৈরি করতে হবে। আক্রমণে মেসির পাশে শুরু করার দৌড়ে এগিয়ে লাউতারো মার্তিনেজ। দারুণ মৌসুম কাটানো ইন্টার মিলান ফরোয়ার্ডের সামনে বড় সুযোগ।
তবে আর্জেন্টিনা জানে, প্রথম ম্যাচে ফেভারিট হওয়া আর মাঠে জেতা এক জিনিস নয়। ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল তারা। পরে সেই দলই শিরোপা জেতে। সেই অভিজ্ঞতা আর্জেন্টিনাকে এবার আরও সতর্ক করেছে। স্কালোনি আলজেরিয়াকে যথেষ্ট সম্মান করেই নামছেন।
আলজেরিয়া কোনোভাবেই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। উত্তর আফ্রিকার দলগুলোকে এখন আর ‘নিশ্চিত তিন পয়েন্ট’ ভাবার সময় নেই। ২০১৪ বিশ্বকাপে আলজেরিয়া শেষ ষোলোয় জার্মানিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়েছিল। এবার তারা এসেছে আরও আত্মবিশ্বাসী দল হিসেবে।
২০১৯ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস চ্যাম্পিয়ন আলজেরিয়া বাছাইপর্বে দারুণ পারফর্ম করেছে। অধিনায়ক রিয়াদ মাহরেজ এখনো দলের সবচেয়ে বড় নাম। ২০ বছর বয়সী ইব্রাহিম মাজা, যাকে আলজেরিয়ায় অনেকে ‘মাজাদোনা’ বলে ডাকেন, বড় মঞ্চে নিজেকে চেনানোর অপেক্ষায়। মোহাম্মদ আমুরা আফ্রিকান বাছাইপর্বে গোল ও অ্যাসিস্টে আলো ছড়িয়েছেন। বাঁ প্রান্তে রায়ান আইত-নৌরিও বড় অস্ত্র।
গোলপোস্টে থাকতে পারেন লুকা জিদান—ফ্রান্স কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে। চোয়ালের চোট কাটিয়ে তিনি খেলতে প্রস্তুত বলে খবর। রক্ষণে রামি বেনসেবাইনির গোড়ালির চোট আলজেরিয়ার জন্য ধাক্কা। তবু ভ্লাদিমির পেতকোভিচের দল সংগঠিত, দ্রুত এবং পাল্টা আক্রমণে বিপজ্জনক।
এই ম্যাচে আরও একটি ঐতিহাসিক পরত আছে। আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়া এর আগে মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯ বছর আগে বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুতে সেই প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৪-৩ গোলে জিতেছিল। মেসি সেদিন জাতীয় দলের হয়ে প্রথমবার জোড়া গোল করেছিলেন। এবার সেই মেসিই আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামছেন।
গ্রুপ ‘জে’তে আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার সঙ্গে আছে অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। ৪৮ দলের নতুন সংস্করণে গ্রুপের শীর্ষ দুই দল যাবে শেষ ৩২-এ, সঙ্গে যাবে সেরা আট তৃতীয় দল। তাই প্রথম ম্যাচে জয় বড় সুবিধা দেবে, তবে ড্র বা হারও টুর্নামেন্ট শেষ করে দেবে না। তবু চ্যাম্পিয়নদের জন্য শুরুটা সব সময় বার্তা বহন করে।
আলজেরিয়ার চোখ শুধু আর্জেন্টিনা ম্যাচে নয়, গ্রুপের শেষ ম্যাচ অস্ট্রিয়ার দিকেও। ১৯৮২ বিশ্বকাপের ‘গিজনের কলঙ্ক’ আজও আলজেরিয়ান ফুটবলের স্মৃতিতে তাজা। অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানির সেই বিতর্কিত ম্যাচের ফলেই সেবার বাদ পড়েছিল আলজেরিয়া। এবার একই গ্রুপে অস্ট্রিয়াকে পাওয়া তাদের জন্য আলাদা আবেগের।
তবু আজকের রাতের আলো মেসি ও আর্জেন্টিনার ওপরই বেশি। অপ্টার সিমুলেশনে আর্জেন্টিনা পরিষ্কার ফেভারিট। কিন্তু এই বিশ্বকাপ ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, ফেভারিটদের পথ সহজ নয়। স্পেন কেপ ভার্দেকে হারাতে পারেনি, ব্রাজিল মরক্কোর সঙ্গে ড্র করেছে, উরুগুয়েও সৌদি আরবের বিপক্ষে জিততে পারেনি।
তাই কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনার শুরুটা কেমন হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন। মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ কি জয় দিয়ে শুরু হবে? নাকি আলজেরিয়া আরেকটি অঘটনের গল্প লিখবে? বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শিরোপা রক্ষার যাত্রা শুরু হচ্ছে। আর মেসি নামছেন ইতিহাসের আরও এক পাতায় নিজের নাম লিখতে।
ম্যাচ তথ্য
আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়া
গ্রুপ: জে
ভেন্যু: কানসাস সিটি স্টেডিয়াম
সময়: বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৭টা
আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ
এমিলিয়ানো মার্তিনেজ; মলিনা/মন্তিয়েল, রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ/ওতামেন্দি, মেদিনা; দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, আলমাদা; মেসি, লাউতারো মার্তিনেজ।
আলজেরিয়ার সম্ভাব্য একাদশ
লুকা জিদান; বেলঘালি, মান্দি, চেরগুই, আইত-নৌরি; বেনতালেব, বুদাউই; মাহরেজ, মাজা, আমুরা; গুইরি।
