×

আন্তর্জাতিক

সিআইএ

ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কেন

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৯ এএম

ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কেন

ইসরাইল গৃহযুদ্ধ বা এমনকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধসের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। ছবি: সংগৃহীত

গভীর হতে থাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কারণে ইসরাইল গৃহযুদ্ধ বা এমনকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধসের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। খবর আনাদোলু এজেন্সির। 

সিআইএ-র বিশেষ শাখা ‘রেড সেল’ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘ফ্র্যাকচার ফ্রম উইথিন’ (ভেতর থেকে ফাটল) শীর্ষক এক গোপন মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে সোমবার (৪ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে। 

সিআইএ-র সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশটির আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে বেশ কিছু জটিল সংকট একসঙ্গে পুঞ্জীভূত হয়ে পরিস্থিতিকে চরম অস্থির করে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা, আকাশচুম্বী সামরিক ব্যয়, পশ্চিম তীরে দখলদার ইসরাইলিদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া নিয়ে সাধারণ জনগণের তীব্র ক্ষোভ। 

এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক লড়াই ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। 

টানা যুদ্ধ পরিস্থিতি ইসরাইলি সমাজের মধ্যকার পুরোনো বিভাজনগুলোকে আরও গভীর করেছে। গাজা, লেবানন ও ইরানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে অংশ নিয়ে বিপুলসংখ্যক সেনা ও রিজার্ভিস্ট মানসিক ট্রমা নিয়ে ফিরে আসছেন। 

এর মধ্যে অতি-অর্থোডক্স পুরুষদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে ছাড় দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 

আরও পড়ুন: হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি সৌদি জোটের

পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্দ্ধমান একাকীত্ব এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও তাদের জনসমর্থন কমে যাওয়াকে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিআইএ। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাইরের এসব চাপ ও ভেতরের অস্থিতিশীলতা একসঙ্গে মিলে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকেই এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ফেলে দিচ্ছে। 

প্রতিবেদিত মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— ইসরাইলের জন্য বড় ঝুঁকি শুধু সীমান্তের বাইরের যুদ্ধ নয়, বরং দেশটির ভেতরে একাধিক সংকট একই সময়ে গভীর হয়ে ওঠা। সিআইএর রেড সেল ইউনিটের কথিত বিশ্লেষণে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সামাজিক প্রভাব, সামরিক নিয়োগ নিয়ে বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন কমে যাওয়াকে পরস্পর সম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়েছে।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র মেরুকরণ রয়েছে। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা, বিচারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিরোধ যুক্ত হয়েছে। কথিত সিআইএ মূল্যায়নে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার লড়াইকে চলমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক উত্তেজনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়ছে কারণ ২৭ অক্টোবর নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে একাধিক সংকট একই সময়ে সক্রিয় থাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ, নির্বাচনের ফল নিয়ে বিরোধ, সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা কিংবা রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত যদি সামাজিক বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এটাই মূল উদ্বেগ।

সবচেয়ে বড় সামাজিক ফাটলগুলোর একটি—সামরিক নিয়োগ

ইসরাইলের সমাজে অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির বিষয়টি দীর্ঘদিনের বিতর্ক। দীর্ঘ যুদ্ধ ও বিপুলসংখ্যক রিজার্ভ সেনা মোতায়েনের পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

প্রতিবেদিত সিআইএ মূল্যায়নে এটিকে অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ বিভাজন হিসেবে দেখা হয়েছে। একদিকে নিয়মিত ও রিজার্ভ সেনাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপ, অন্যদিকে একটি বড় ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি—এই বৈপরীত্য সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে সংকটটি শুধু সামরিক নয়; এটি ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। যারা দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করছেন, তাদের একটি অংশের কাছে অন্য একটি গোষ্ঠীর ব্যাপক হারে সামরিক সেবার বাইরে থাকা বৈষম্যমূলক বলে মনে হতে পারে। ফলে সামরিক নিয়োগের প্রশ্নটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

দীর্ঘ যুদ্ধের সামাজিক মূল্য

গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত ইসরাইলি সমাজের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে বলে কথিত মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনা ও রিজার্ভিস্টদের একটি অংশ মানসিক আঘাত নিয়ে ফিরছেন—এটিও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ যুদ্ধ শুধু সামরিক ব্যয় বাড়ায় না। এটি পরিবার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনেও প্রভাব ফেলে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বারবার রিজার্ভ ডিউটিতে গেলে অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি হয়।

ফলে যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে নিরাপত্তা সংকট থেকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে—মূল্যায়নের যুক্তিটি সেখানেই।

অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক ব্যয়

প্রতিবেদনে ইসরাইলের অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধিকেও ঝুঁকির অন্যতম উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর চাপ বাড়ায়।

সামরিক ব্যয় বাড়লে সরকারের সামনে কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়—একদিকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, অন্যদিকে নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক সেবা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়গুলোও সামলাতে হয়।

এই চাপ যদি রাজনৈতিক বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

পশ্চিম তীরে সহিংসতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কথিত মূল্যায়নে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতাকেও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার একটি উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; ইসরাইলের ভেতরেও এ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। এক পক্ষ কঠোর নিরাপত্তা ও বসতি সম্প্রসারণকে সমর্থন করে, অন্য পক্ষ এর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

ফলে পশ্চিম তীরের সহিংসতা ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাই ওই মূল্যায়নে প্রতিফলিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাও অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিণত হতে পারে

সিআইএ মূল্যায়নে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক অবস্থানও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ার বিষয়টি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক মর্যাদার নয়। ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপরও নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক সমর্থন কমার আশঙ্কা দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।

টার্কি টুডে-এর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের একটি জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইলকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন, যা আগের বছরের ৫৩ শতাংশের তুলনায় বেশি।

প্রতিবেদিত মূল্যায়নের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধারণা হলো—সমস্যাগুলো আলাদা আলাদা থাকলে হয়তো রাষ্ট্র তা সামাল দিতে পারে। কিন্তু একাধিক সংকট একই সময়ে সক্রিয় হলে একটি ছোট ঘটনা বড় রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলা একটি মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচন ও বিদ্যমান বিভাজনের কারণে পরিস্থিতিকে এমন একটি অবস্থান হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে একটি ঘটনা অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে দ্রুত তীব্র করে তুলতে পারে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘৩৫ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হবে এক মাসে’

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ‘৩৫ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হবে এক মাসে’

ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কেন

সিআইএ ইসরাইলে গৃহযুদ্ধ ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কেন

পুড়ে ছাই হলো গৌরীপুরের ঝলমল সিনেমা হল

পুড়ে ছাই হলো গৌরীপুরের ঝলমল সিনেমা হল

হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি সৌদি জোটের

হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি সৌদি জোটের

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App