রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তীব্র আতঙ্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১১ অক্টোবর) বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনালে অজ্ঞাতপরিচয় প্রক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আগুন ধরে যায়। আগের দিন একই বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর নতুন এই ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। খবর রয়টার্স ও এপির।
ইয়েমেনে সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রোববার বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৪-এ একটি অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে আগুন ধরে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগুন নিয়ন্ত্রণ ও পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ শুরু করে। তবে সর্বশেষ হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না কিংবা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানানো হয়নি।
জোট আরও জানিয়েছে, বিমানবন্দরের আশপাশে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার পর সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটি প্রতিহত করে। তবে টার্মিনালে আঘাত হানা প্রক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্র একই হামলার অংশ কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি। সর্বশেষ হামলার জন্যও তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে দায়ী করেনি জোট।
এর আগে শনিবার (১০ অক্টোবর) রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হন। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় আহত হন ৩০৯ জন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর ছিল।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক এবং দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক নিহত হয়েছেন। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয় এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা শুরু করে কর্তৃপক্ষ।
একই বিমানবন্দরে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক হামলার ঘটনা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়ায় এখানে যাত্রী, বিমানকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ফলে এ ধরনের হামলায় প্রাণহানির পাশাপাশি বিমান চলাচল, যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশিদের মৃত্যু, আহতদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর তাঁদের পরিচয় শনাক্ত, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন: আসিফ মাহমুদের ফেসবুক পোস্ট নিষিদ্ধ করল ভারত
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে রিয়াদে বাংলাদেশ মিশন সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এ ঘটনায় আহত বাংলাদেশিদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলেও পরবর্তী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের গন্তব্য। দেশটির বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করেন। এ কারণে বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ায়। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, তাঁদের পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর এবং আহতদের চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হামলার পেছনে কারা?
রিয়াদ বিমানবন্দরে আগের দিনের হামলার জন্য ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দায়ী করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরাও সৌদি আরবের বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। তবে রোববারের সর্বশেষ হামলার দায় কার, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে সরকারপন্থি বাহিনী ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত চলছে। এই সংঘাতে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে, হুতিরা সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে বিভিন্ন সময়ে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাত এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়ছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা বাড়তে থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিমান চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলকেন্দ্র। সেখানে হামলার পর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের যাতায়াত ব্যাহত হয়েছে। বিমানবন্দর বন্ধ থাকলে ফ্লাইট বাতিল বা অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া, যাত্রীদের আটকে পড়া এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর সূচিতে পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: ইসলামাবাদে রেড অ্যালার্ট, ১৪৪ ধারা জারি
এ ধরনের হামলা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পাশাপাশি টার্মিনাল, রানওয়ে, যাত্রীদের অপেক্ষাকক্ষ এবং অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। হামলার পর বিমানবন্দর কখন পুরোপুরি চালু হবে, যাত্রীদের চলাচল কখন স্বাভাবিক হবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী হতে পারে?
একই বিমানবন্দরে পরপর হামলার ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ হামলার জবাব দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে।
তবে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে হামলার দায় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য, সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া এবং সংঘাত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। একই সঙ্গে বেসামরিক স্থাপনা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাত প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, সেখানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্যও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, তাঁদের পরিবারকে সহায়তা এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
