মারা গেল জোড়া লাগা দুই শিশু
এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বুক থেকে পেট পর্যন্ত জন্মগতভাবে জোড়া লাগা দুই কন্যাশিশুকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলেও তাদের বাঁচানো গেল না। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জয়নব ও উম্মে কুলসুম নামে তিন মাসের শিশু দুটির মৃত্যু হয়েছে। জয়নব ও উম্মে কুলসুম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া গ্রামের দোকান কর্মচারী নাহিদ হাসান ও সানজিদা আক্তার দম্পতির সন্তান।
বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যমজ শিশু দুটি মারা যায়। বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে জোড়া লাগা দুই বোনের মরদেহ নিজ এলাকা উপজেলার বিলগাথুয়া গ্রামে নিয়ে আসা হয়। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল ৯টায় বিলগাথুয়া মধ্যপাড়া গোরস্থানে জানাজা শেষে একই কবরে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সোমবার রাতে অসুস্থ শিশু দুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর চিকিৎসকরা বোর্ড গঠন করে কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন। চিকিৎসা শুরুর একদিন পর বুধবার দুপুরে হঠাৎ তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাদের মৃত্যু হয়।
ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শিশু দুটির হার্ট ছিল একটি। সেটিও ছিল ফুটো। যার ফলে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।’
গত ৪ মে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে জোড়া লাগা যমজ শিশু দুটির জন্ম হয়। জন্মের পর চিকিৎসকরা তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন এবং পরিবারকে জানান, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করা সম্ভব। তবে এ জন্য কয়েক ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তিন মাস পর শিশু দুটিকে আবার ঢাকায় নেওয়ার কথা থাকলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছিল না। নাহিদ হাসান মাত্র ৯-১০ হাজার টাকা মাসিক আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি দুই শিশুর দুধ ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
এমন পরিস্থিতিতে দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএনও অনিন্দ্য গুহ পরিবারটিকে সহায়তা করতে তাদের বাড়িতে যান। তিনি প্রাথমিকভাবে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং ২০ হাজার টাকা মূল্যের প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেন। এ সময় পরিবারটির পাশে থাকার আশ্বাস দেন ইউএনও।
সম্প্রতি জোড়া লাগা শিশু দুটির ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের অসহায়ত্বের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করা হলে তিনি শিশু দুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। প্রধানমন্ত্রী জোড়া লাগা শিশু দুটিকে দ্রুত ঢাকায় এনে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল শিশু দুটির বাবা নাহিদ হাসানকে ফোন করে তাদের চিকিৎসার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ সময় মন্ত্রী অতিদ্রুত শিশু দুটিকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পরামর্শ দেন। মন্ত্রীর ফোনের পর বিলম্ব না করে স্বজনদের নিয়ে নাহিদ হাসান পরদিন সোমবার সকালে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ওইদিন রাত ৮টার দিকে শিশু দুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়।
ওই রাতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল হাসপাতালে ছুটে যান। তিনি চিকিৎসকদের কাছে শিশু দুটির সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং পরিবারকে হাতখরচের টাকা দেন। পরে মন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জোড়া লাগা শিশু দুটির চিকিৎসায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এনে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হবে।
কিন্তু তার আগেই ঢাকার চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল ৩ মাস ৯ দিন বয়সী বুক-পেট জোড়া লাগা দুই বোন।
শিশু দুটির বাবা নাহিদ হাসান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, চিকিৎসকরাও চেষ্টা করছিলেন। আমরা নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার ফুটফুটে বাচ্চা দুটোকে আর বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারলাম না। আল্লাহ তাদের তুলে নিলেন। আল্লাহ যেন আমাদের এই কষ্ট সহ্য করার শক্তি দেন।’
দরিদ্র পরিবারটি অর্থের অভাবে জোড়া লাগা দুই সন্তানের চিকিৎসা করাতে না পারায় সরকার তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ায় পরিবারটিতে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই আশা নিভে গেল। বড় আশা নিয়ে জোড়া লাগা শিশু দুটিকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল। উন্নত চিকিৎসা পেলে জয়নব ও উম্মে কুলসুম সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে- এমন আশায় নতুন করে বুক বেঁধেছিল পরিবারটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের বাড়ি ফিরতে হলো যমজ দুই শিশুর নিথর দেহ সঙ্গে নিয়ে।
