জাতিসংঘে ভাষণ নিয়ে মন্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শিক্ষককে ছেড়ে দিল পুলিশ
এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫ এএম
ছবি : ভোরের কাগজ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে দেওয়া বাংলা ভাষণ নিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগে আটক স্কুলশিক্ষককে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পরে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেন। স্কুলশিক্ষকের নাম গোলাম কিবরিয়া লালন (৫৫)। তিনি ভারতীয় সীমান্তবর্তী প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে ১২টার দিকে আটক শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে পুলিশ হেফাজত থেকে উপজেলার প্রাগপুরে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেয় উপজেলা প্রশাসন। এ সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রদীপ কুমার দাস, দৌলতপুর থানার ওসি খালেদুর রহমানসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা শিক্ষকের বাড়িতে কিছু সময় অবস্থান করেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। এর আগে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গেট থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক করা হয়।
দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নিয়ে কটূক্তি এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত করার অভিযোগ ওঠায় তাকে আটক করে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছিল। এর মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আসে। নির্দেশ পেয়ে রাতেই পূর্ণ নিরাপত্তায় শিক্ষক গোলাম কিবরিয়াকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালন নিজের দোষ স্বীকার করে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হাজারো ধন্যবাদ দিয়েও শেষ করা যাবে না, কারণ আমি অপরাধী, একটা কথা আমার দ্বারা ভুল হয়ে গেছে। আমার মতো একজন নগণ্য মানুষকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজগুণে ক্ষমা করে দেওয়ায় আমি মানবিক প্রধানমন্ত্রীকে হাজারও কৃতজ্ঞতা জানাই।’
এ সময় শিক্ষক গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী, কন্যা ও পরিবারের সদস্যরা তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দৌলতপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রদীপ কুমার দাস বলেন, শিক্ষক গোলাম কিবরিয়ার একটি মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি। তার সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে তিনি ও তার পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে সেই নিশ্চয়তা দিয়েছি এবং সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
এদিকে বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে এক স্কুলশিক্ষকের কটূক্তি ও আপত্তিকর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অধিবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাদের বিক্ষোভের পর পুলিশ ওই শিক্ষককে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।’
ফেসবুক পোস্টে মাহ্দী আমিন বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী সংক্ষুব্ধ হন এবং সংশ্লিষ্ট থানাকে নির্দেশ দেন, শিক্ষককে সসম্মানে ছেড়ে দিয়ে নিরাপদে তাঁর বাসায় পৌঁছে দিতে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেয়।’
মুখপাত্র মাহ্দী আমিনের পোস্টে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে; প্রত্যেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত তাঁর নিজস্ব। কারও মতের সঙ্গে একমত না হলেও তাঁর মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা উচিত। ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি এই সম্মানই গণতন্ত্রের শক্তি। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ইতিবাচক আচরণ, পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি সমাজকে শক্তিশালী করবে।’
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ৩টার দিকে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির বাংলা ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালন সম্প্রতি জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বাংলা ভাষণের প্রসঙ্গ তোলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে কটূক্তি করেন। এ সময় শিক্ষক লালন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করে একটি আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ নিয়ে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
পরদিন বুধবার সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধরা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় পুলিশ শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে ঘটনাটি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর বের হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
