নীতিগত অগ্রাধিকার পেলে আয়ুর্বেদিক হতে পারে জাতীয় সম্পদ
মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা আধুনিক চিকিৎসার প্রসঙ্গ তুলতে অভ্যস্ত। কিন্তু হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, প্রকৃতিনির্ভর জ্ঞান ও মানবদেহের সামগ্রিক ভারসাম্যকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় দেশের মাটিতেই যার দীর্ঘ ঐতিহ্য তা আজও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারতীয় উপমহাদেশে আয়ুর্বেদের বিকাশ ঘটেছিল সুসংগঠিত শাস্ত্রীয় ভিত্তির ওপর। প্রাচীন ঋষি চরক ও সুশ্রুত তাঁদের সংকলনে যে চিকিৎসা দর্শন তুলে ধরেছেন, তা কেবল রোগ নিরাময়ের কৌশল নয়; বরং জীবনযাপনের একটি বিজ্ঞান।
‘আয়ুর্বেদ’ শব্দের অর্থই হলো জীবন সম্পর্কে জ্ঞান। এখানে রোগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয় না; দেহ, মন ও পরিবেশ এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হলেই রোগের উৎপত্তি। তাই প্রতিরোধই আয়ুর্বেদের মূল শক্তি। ভেষজ উদ্ভিদ, খনিজ ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা দেওয়ার দাবি রাখে বলে এমন বিশ্বাস গ্রামীণ জনপদে এখনো দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান। আধুনিক গবেষণাও বহু ক্ষেত্রে ভেষজ উপাদানের কার্যকারিতা স্বীকার করছে। বিশ্বজুড়ে ‘হোলিস্টিক মেডিসিন’ বা সমন্বিত চিকিৎসা দর্শনের যে পুনর্জাগরণ দেখা যাচ্ছে, তা আয়ুর্বেদের মৌলিক দর্শনের সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ।
আরো পড়ুন: জামায়াত আমিরকে প্রধান উপদেষ্টার বার্তা
আরো পড়ুন: শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ভানুয়াতু
বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার সম্ভাবনা অপরিসীম। এ দেশের জলবায়ু ও মাটির গুণাগুণ শতাধিক ঔষধি গাছ চাষের জন্য অনুকূল। অথচ আমরা এখনো ভেষজ কাঁচামালের (রো-মেটেরিয়ালস) জন্য অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। যদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ঔষধি গাছের চাষ সম্প্রসারণ করা যেত, তাহলে একদিকে যেমন কাঁচামালের ঘাটতি দূর হতো, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হতো। কৃষকরা ধান-গমের পাশাপাশি তুলসী, অশ্বগন্ধা, কালমেঘ, শতাবরী বা নিমের মতো গাছ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করলে তা একটি টেকসই ভেষজ শিল্পের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারত। এতে দেশের ভেতরেই গড়ে উঠত একটি শক্তিশালী ফার্মাসিউটিক্যাল চেইন, যা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে শতভাগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হতো।
কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধানও কম নয়। সারা দেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারি পর্যায়ে আয়ুর্বেদিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একটি স্বীকৃত ও প্রাচীন চিকিৎসাব্যবস্থা যদি কাঠামোগত অবহেলার শিকার হয়, তবে তার প্রসার ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক। স্বাস্থ্যব্যবস্থার বহুমাত্রিকতায় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে সমান্তরাল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন জনবল নিয়োগ, গবেষণা তহবিল এবং নীতিগত অগ্রাধিকার।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মধ্যে নতুন আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। তারা প্রত্যাশা করছেন, আগামী সরকার উপজেলা পর্যায়ে শূন্যপদ পূরণ, ভেষজ চাষে প্রণোদনা এবং মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনে নীতিগত সহায়তা দেবে। এই প্রত্যাশা অমূলক নয়; কারণ উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানে কেবল আধুনিক হাসপাতাল নয়, বরং বিকল্প ও পরিপূরক চিকিৎসার সমন্বিত বিকাশ।
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে উন্নত ও কার্যকর প্রমাণ করতে হলে আবেগের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মাননিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই জরুরি। প্রাকৃতিক চিকিৎসা মানেই অনিয়ন্ত্রিত নয়; বরং সঠিক মানদণ্ডে প্রস্তুত ও প্রয়োগ করলে এটি হতে পারে নিরাপদ ও টেকসই সমাধান। বিশ্ব যখন কেমিক্যাল নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবছে, তখন বাংলাদেশের উচিত তার ঐতিহ্যগত সম্পদকে আধুনিক কাঠামোয় পুনর্গঠন করা।
স্বাস্থ্য খাতে টেকসই উন্নয়ন চাইলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে প্রান্তিক পর্যায় থেকে মূলধারায় আনার এখনই সময়। ভেষজ সম্পদের বাণিজ্যিক চাষ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পূর্ণাঙ্গ পদায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং জনসচেতনতাসহ এই চার স্তম্ভে দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী আয়ুর্বেদিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে দর্শন আয়ুর্বেদ ধারণ করে, তা কেবল চিকিৎসা নয়-একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণেরও ভিত্তি হতে পারে।
লেখক-
মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ও সাংবাদিক
