ইরানের শাসনব্যবস্থা কি ভেঙে পড়ছে?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড। ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ ১৮ দিনে গড়িয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। আলী লারিজানিসহ অনেক শীর্ষ নেতা এবং রেভলিউশনারি গার্ডের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার মৃত্যুও ঘটেছে। ফলে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে বড় ধরনের আঘাত লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক হাবিব হোসেইনি ফার্দ জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে (ডিডাব্লিউ) বলেন, যুদ্ধ শুরুর তিন সপ্তাহ পর এখন বলতে হচ্ছে, আগের ধারণার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। ইরানের ক্ষমতার কাঠামো প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়েছে।
রেভলিউশনারি গার্ড বড় ক্ষতির মুখে পড়লেও তারা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তারা এখনও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফ্রন্টে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের শক্তির মূল ভিত্তি হলো বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ও কার্যকর কমান্ড কাঠামো।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ওমান, সৌদি আরব, ইসরায়েল, জর্ডান, সাইপ্রাস, আজারবাইজান, আমিরাত, কাতার, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের বিরুদ্ধে ইরান তিনশর বেশি হামলা চালিয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সোমবার মধ্যরাতের পর থেকে তারা ৬০টি ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছেন। এই পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আঘারচি আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ইরান তাদের সামরিক কাঠামো ও রেভলিউশনারি গার্ডের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর রেভলিউশনারি গার্ড গঠিত হয়। তৎকালীন শাসকরা শাহের সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। বর্তমানে নিয়মিত সেনাবাহিনী ও রেভলিউশনারি গার্ড মিলেই ইরানের সামরিক শক্তি গড়ে উঠেছে, যা সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে পরিচালিত হয়। এ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় দুই লাখ।
হোসেইনি ফার্দ বলেন, গত দুই দশকে রেভলিউশনারি গার্ড একটি পদানুক্রমিক কাঠামো থেকে নেটওয়ার্কভিত্তিক কাঠামোয় রূপ নিয়েছে। আঞ্চলিক কমান্ডগুলো এখন অনেক ক্ষমতাধর এবং তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আরো পড়ুন : ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প-যুক্তরাজ্য দ্বন্দ্ব, ঝুঁকিতে রাজা চার্লসের যুক্তরাষ্ট্র সফর
তিনি আরো বলেন, ইরানের বড় শক্তি হলো ভূগর্ভস্থ মিসাইল ভাণ্ডার। অল্প সময়ে তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে তারা ইরানের সামরিক শক্তির মূলে আঘাত করেছে। কিন্তু তারপরও ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, এটাই তাদের সক্ষমতার প্রমাণ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের ১৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে। তা সত্ত্বেও ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ইরান রকেট হামলা চালাচ্ছে। ইরাকে মার্কিন দূতাবাসে ২৪ ঘণ্টায় দুইবার হামলার ঘটনাও ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশেও হামলা চালানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজা তালেবি বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এ ধারণা অত্যন্ত সরলীকৃত। তাদের দুর্বলতা নিয়ে যতই আলোচনা হোক, বাস্তবে তাদের কাঠামো আলাদা। মতাদর্শনির্ভর সেনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরো সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করবে।
তিনি আরো বলেন, রেভলিউশনারি গার্ড শুধু সামরিক বাহিনী নয়, তাদের অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক প্রভাবও রয়েছে। তার মতে, ক্ষমতার বাইরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরো কাঠামো ধসে পড়বে, এমনটা একেবারেই নয়। ধসে পড়লে সিরিয়া বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আপাতত ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তালেবি মনে করেন, সামরিক ব্যবস্থা ধসে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
হোসেইনি ফার্দের মতে, ইসরায়েল ইরানকে দুর্বল করতে চাইছে। তারা হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে চায় এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ উসকে দিতে চায়।
তিনি আরো বলেন, নিকট ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরতি বা রেভলিউশনারি গার্ডের পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। তার মতে, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অবকাঠামোতেও আঘাত হানতে চাইছে। ফলে হয় এই যুদ্ধ চলতে থাকবে অথবা তার পরিধি আরো বিস্তৃত হবে।
