×

মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে ফের বাড়ছে উত্তেজনা

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে ফের বাড়ছে উত্তেজনা

একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফের উত্তেজনা বেড়েছে। যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে উভয় দেশ। এতে এই দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে শঙ্কা বেড়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা লড়াই বন্ধের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একটি রূপরেখা চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে এই শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এই চুক্তিকে অপমানজনক বলে মনে করছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও তাদের মিত্ররা। এর প্রতিবাদে লেবাননের বৈরুতে তীব্র বিক্ষোভ করেছে হিজবুল্লাহ সমর্থকরা। ফলে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে অশান্ত হয়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্য।

ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার। এদিন ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এ হামলার প্রতিবাদে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনায় আঘাত হানে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক টেলিগ্রাম বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।

মূলত গত ১৭ জুনের সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি ৬০ দিনের জন্য টোল-মুক্ত রাখার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, চুক্তির শর্ত অমান্য করে ওমান উপকূলে বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ইরান এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের একক নিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করেছে দেশটি।

এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানি বাহিনীর আগ্রাসন যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে ইরানের এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সমন্বয় ও সহায়তা অব্যাহত রাখবে তারা।

হামলার বিষয়ে সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার, পাশাপাশি উপকূলীয় রাডার স্থাপনাগুলোতে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। যা হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে চালানো ড্রোন হামলার ‘শক্তিশালী জবাব’ বলে দাবি করেছে সেন্টকম।

গত বৃহস্পতিবার হরমুজে ওই বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুদ্ধবিরতি বোকামিপূর্ণভাবে লঙ্ঘন করেছে ইরান।’ এর জবাব যুক্তরাষ্ট্র দেবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের হামলার জবাব দেয়া হবে কিনা, তা দেখতেই পাবেন।’ এরপরই গত শুক্রবার ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স লিখেছেন, ‘ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। আমরা সেই চুক্তি মেনে চলেছি। সমঝোতা স্মারক কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি থাকলে, তারা কথা বলতে পারে। তবে সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেয়া হবে।’

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, ‘বরাবরের মতোই প্রতিশ্রæতি লঙ্ঘন করেছে ওয়াশিংটন। তাই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন থাকা বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ফের আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি হলে আমাদের জবাব আরো ব্যাপক ও কঠোর হবে।’

একই সুরে কথা বলেছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি। এক্সে দেয়া এক পোস্টে ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন তিনি আলোচনার নীতি কিংবা যুদ্ধবিরতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন।’ যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘যুদ্ধবিরতির বেপরোয়া লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করা। তবে ইসরায়েল এই চুক্তির সরাসরি অংশ না হওয়ায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পাল্টা হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহও। তাই হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-লেবানন সরকারের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করে তারা। তবে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে হিজবুল্লাহ। পাশাপাশি এই চুক্তির প্রতিবাদে লেবাননের বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করে হিজবুল্লাহ সমর্থকরা। এ সময় তারা রাস্তায় নেমে আসেন, আগুন ধরিয়ে দেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে হিজবুল্লাহ ও ইরানের পতাকা দেখা যায়। একই সময়ে অস্ত্রধারী হিজবুল্লাহ-সমর্থকরা মোটরযানের বহর নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরের বিভিন্ন স্থানে সেনা মোতায়েন করা হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী একাধিক তল্লাশিচৌকি স্থাপন করে।

হিজবুল্লাহ বিশ্বাস করে, এ চুক্তির ফলে লেবাননের যেসব অঞ্চল এখনো ইসরায়েলের দখলে রয়েছে, সেখানে সামরিক তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েল আরো বেশি স্বাধীনতা পাবে। তাই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণভাবে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। এই শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা চুক্তি মেনে নেবে না। এ চুক্তি কার্যকর করার চেষ্টা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে লেবানন সরকারকে সতর্ক করেছে হিজবুল্লাহ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল একযোগে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে। দুইদিন পর ২ মার্চ লেবাননে আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলার পাশাপাশি স্থল অভিযান চালিয়ে বিশাল অংশ দখল করে নেন ইসরায়েলের সেনারা। তাদের আগ্রাসনের মুখে লেবাননের ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা, মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের আঘাত এবং লেবানন সরকার-ইসরায়েলের মধ্যে হওয়া চুক্তিকে হিজবুল্লার মেনে না নেয়া, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধভীতি ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরো কঠিন কূটনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ আরো মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

স্পারসোকে আধুনিক-যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

স্পারসোকে আধুনিক-যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

ভাঙ্গায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক

ভাঙ্গায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক

মধ্যপ্রাচ্যের ৮ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি ইরানের

মধ্যপ্রাচ্যের ৮ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি ইরানের

গণপিটুনির শিকার যুবক, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু

গণপিটুনির শিকার যুবক, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App