অভিযানের পরও থামছে না বালু-পাথর লুট
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় নদী, ঝরনা ও পাহাড় কেটে অবাধে পাথর ও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র প্রকাশ্যে দিনের বেলায় পাহাড় ও নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু উত্তোলন করে রাতের আঁধারে বিভিন্ন যানবাহনে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে বিক্রি করছে।
অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের কারণে গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদ লুটের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়। এ সৌন্দর্যকে ঘিরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে গজনী এলাকায় গড়ে তোলা হয় গজনী অবকাশ বিনোদন কেন্দ্র। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে আসেন। পর্যটনকেন্দ্র থেকে সরকারও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেয়ে থাকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালঘোষা নদীর গান্ধিগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, শতাধিক শ্রমিক বেলচা, কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর ও বালু সংগ্রহ করছেন। পরে এসব পাথর ও বালু টুকরিতে করে মাথায় নিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, রাত ১২টার পর থেকে ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকে করে উত্তোলন করা পাথর-বালু বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এ কর্মকাণ্ড চলে বলেও অভিযোগ তাঁদের। এতে প্রতিরাতে বিপুল পরিমাণ পাথর-বালু পাচার হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
দীর্ঘদিন ধরে এভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি নদী ও ঝরনার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে বালুবাহী যানবাহন আটক, জরিমানা এবং জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযানের পরও অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হয়নি।
গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র গাড়ি আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা ও জিয়াউর রহমান নামের এক বনপ্রহরীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বালু উত্তোলনকারীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে ওই দুই বনকর্মী গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার পর থেকে বালু উত্তোলনকারীদের প্রতিরোধে বন বিভাগও হিমশিম খাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নদীর বালুর দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। ফলে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করার মূল দায়িত্ব বন বিভাগের নয়।
রাংটিয়া ফরেস্ট রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক এসবি তানভির আহমেদ ইমন বলেন, কেউ বালুভর্তি গাড়ি পাচারের সময় তথ্য দিলে তা আটক করা হবে।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গারো পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট বন্ধে প্রশাসন ও বন বিভাগের সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। তা না হলে অবৈধ পাথর-বালু উত্তোলনের কারণে গারো পাহাড়ের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
