মব ভায়োলেন্স
রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘ ১৭ মাসে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিলো বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সংস্থাটি বলেছেন, এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানামুখী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক্-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘ দেশে মব ভায়োলেন্স এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো এই বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি। মব সন্ত্রাস করে বিভিন্ন অফিস আক্রমণ করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই সময়ে কিছু অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এর মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের যে চরিত্র, সক্রিয়তা ও আদর্শ ছিলো, সেটা দুর্বল হয়েছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত ছিলো। মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় নাগরিক নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে জনমনে হতাশা ও উদ্বেগ বেড়েছে।’
রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা:
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ১৭ মাসে সারাদেশে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ১৯৫ জন নিহত ও ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সমাবেশ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি ও স্থাপনা দখল এসব ঘটনার প্রধান কারণ। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০৪টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৩১ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার ২৩৬টি ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন। এ ছাড়া ৩ শতাধিকের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন এবং শতাধিক রাজনৈতিক কার্যালয় ও ১৩০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই তিন মাসে ১৫৫টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়ন–বিরোধে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
মব ভায়োলেন্স ও সাংবাদিক নির্যাতন:
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘ ১৭ মাসে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ৪১৩টি ঘটনায় মোট ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হন। সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলায় মোট ৬ জন নিহতসহ ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এ সময়ে ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
এদিবে, সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় ৪১টি মামলায় মোট ৬৯ জন অভিযুক্ত ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হন। এসব মামলার অধিকাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টকে কেন্দ্র করে হওয়ায় আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন:
এই ১৭ মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ও নির্যাতনে মোট ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জন আসামির, যার মধ্যে ৪৪ জন কয়েদি ও ৮৩ জন হাজতি। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনসহ কয়েকজনের মৃত্যু ঘিরে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুলেছে তাদের পরিবার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১৭টি মন্দির, ৬৩টি প্রতিমা ও ৬৫টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
মাজার ও সীমান্ত হত্যা:
সারাদেশজুড়ে প্রায় শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। দেশের সীমান্তে ১১০টি ঘটনায় ৪৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে হামলায় ৩ জন নিহত হন।
একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১ হাজার ১৬ জন এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৪৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া শ্রমিক নির্যাতন ও দুর্ঘটনায় শত শত শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএস জানিয়েছে, ‘দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক ও নিজস্ব উপায়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে মনিরুজ্জামানসহ সংগঠনের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।’
